প্রচ্ছদ » দেশের বাইরে » বিস্তারিত
জ্বালানি সংকটে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের বৈদ্যুতিক ট্রাকের চাহিদা তুঙ্গে
২০২৬ আগস্ট ১৪ ১২:২৯:১৮
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় এশিয়ার বিভিন্ন দেশে চীনের বৈদ্যুতিক ট্রাকের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারেও বৈদ্যুতিক ট্রাকের বিক্রি বাড়ছে। ফলে জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ দ্রুত বৈদ্যুতিক যানবাহনের দিকে ঝুঁকছে।
হালকা ট্রাক থেকে শুরু করে ভারী ট্রাক ও ট্রেইলার পর্যন্ত বৈদ্যুতিক যানবাহন ব্যবহারে চীনের দ্রুত অগ্রগতি দেশটির বিশাল গাড়ির বাজারকে ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব থেকে কিছুটা সুরক্ষা দিয়েছে। এখন এশিয়ার অন্যান্য দেশও সেই পথ অনুসরণ করতে আগ্রহী হয়ে উঠছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করার পরের চার মাসে চীন থেকে ভারী বৈদ্যুতিক ট্রাকের রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। এ সময়ে মোট ১৬ হাজার ৮২৩টি ভারী বৈদ্যুতিক ট্রাক রপ্তানি করেছে চীন।
এর প্রায় অর্ধেক গেছে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে। দক্ষিণ এশিয়ায় চীনা বৈদ্যুতিক ট্রাকের রপ্তানি পাঁচ গুণেরও বেশি বেড়েছে। আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রপ্তানি বেড়েছে প্রায় তিন গুণ।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ, সুযোগ দেখছে চীন
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশ তেলের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ফলে এসব দেশে ডিজেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বৈদ্যুতিক ট্রাক নির্মাতা চীনের জন্য নতুন বাজার তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর পর শ্রীলঙ্কায় ডিজেলের দাম ৪৮ শতাংশ এবং ফিলিপাইনে ৫৭ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে চীনে সরকারি তথ্য অনুযায়ী ডিজেলের দাম বেড়েছে ১৫ শতাংশ।
চীনের বৈদ্যুতিক ভারী ট্রাক নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সানির আন্তর্জাতিক বিপণন বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট ঝাওটিং ইউ বলেন, যুদ্ধ নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করেছে।
বর্তমানে চীনের বৈদ্যুতিক ট্রাকের রপ্তানির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। চীনের গাড়ি ও মোটরসাইকেল রপ্তানির তুলনায় এটি খুবই সামান্য। এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ভারী ট্রাকের বহর যেখানে লাখ লাখ, সেখানে বৈদ্যুতিক ট্রাকের সংখ্যা এখনো সীমিত।
তবে এই প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে এবং চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারের মতো দ্রুত বৈদ্যুতিক ট্রাকের ব্যবহার বাড়তে থাকলে ডিজেলের ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়তে পারে।
চীনে দ্রুত বাড়ছে বৈদ্যুতিক ট্রাক
চীনে ২০২১ সালে বৈদ্যুতিক ট্রাকের বাজার প্রায় শূন্য থেকে শুরু হয়েছিল। গত বছর দেশটির মোট ট্রাক বিক্রির প্রায় ৩০ শতাংশই ছিল বৈদ্যুতিক ট্রাক। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে চীনে বিক্রি হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার বৈদ্যুতিক ট্রাক।
এরই মধ্যে চীনে ডিজেলের ব্যবহার গত বছর থেকে কমতে শুরু করেছে।
সানি আগে মূলত ইউরোপের বাজারে গুরুত্ব দিত। তবে এখন প্রতিষ্ঠানটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে ঝুঁকছে এবং কম দামের বৈদ্যুতিক ট্রাক তৈরি করছে বলে জানান ইউ।
তিনি জানান, জুন মাসে প্রতিষ্ঠানটি একসঙ্গে ৮৮০টি ভারী বৈদ্যুতিক ট্রাকের সবচেয়ে বড় রপ্তানি অর্ডার পাঠিয়েছে। তবে চুক্তিটি বেসরকারি হওয়ায় কোন দেশে এসব ট্রাক পাঠানো হয়েছে তা প্রকাশ করেননি তিনি।
ইউ বলেন, তেলের দাম বাড়ার আগে এসব দেশে একটি বৈদ্যুতিক ভারী ট্রাকে বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পেতে প্রায় ২৮ মাস সময় লাগত। এখন সেই সময় কমে প্রায় ১৮ মাসে নেমে এসেছে।
সানি মনে করছে, যুদ্ধের প্রভাবে আগামী অন্তত এক বছর এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় বৈদ্যুতিক ট্রাকের বাজার দ্রুত বাড়তে পারে।
জ্বালানির দাম বাড়ায় বৈদ্যুতিক ট্রাকে আগ্রহ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে বৈদ্যুতিক ডেলিভারি ভ্যান এখন ধীরে ধীরে মূলধারায় পরিণত হচ্ছে। তবে ভারী বৈদ্যুতিক ট্রাকের ব্যবহার সেখানে তুলনামূলকভাবে ধীরগতিতে বাড়ছে।
এর উদাহরণ হিসেবে টেসলার বৈদ্যুতিক ‘সেমি’ ট্রাকের কথা বলা যায়। প্রায় এক দশক আগে ট্রাক পরিবহনের অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও প্রতিষ্ঠানটি চলতি বছরের মধ্যে ট্রাকটির ব্যাপক উৎপাদনের লক্ষ্য থেকে সরে এসেছে।
এদিকে চীনে বৈদ্যুতিক ট্রাকের সংখ্যা বাড়ায় ডিজেল ব্যবহারের প্রয়োজনও কমছে। শুধু চলতি বছর চীনের বৈদ্যুতিক ট্রাকগুলো ডিজেল ব্যবহার না করায় প্রায় ১৪ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল তেলের সমপরিমাণ জ্বালানি সাশ্রয় করবে।
এটি চীনের মোট তেল ব্যবহারের ৩ শতাংশেরও বেশি এবং কুয়েত থেকে চীনের এক বছরে আমদানি করা মোট তেলের প্রায় সমপরিমাণ।
ফলে ইরান যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকট একদিকে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য নতুন চাপ তৈরি করলেও, অন্যদিকে চীনের বৈদ্যুতিক ট্রাক নির্মাতাদের জন্য এশিয়ার বিশাল বাজারে প্রবেশের নতুন দরজা খুলে দিয়েছে।
তথ্যসূত্র : রয়টার্স
(ওএস/এএস/আগস্ট ১৪, ২০২৬)
