ঢাকা, রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬, ১ ভাদ্র ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » দেশের খবর » বিস্তারিত

বিএনপি নেতাকে নিয়ে ভাইরাল ভিডিওতে তোলপাড়

ঝালকাঠিতে অপপ্রচারের প্রতিবাদে বিএনপির সভা, তদন্ত ও জড়িতদের শাস্তির দাবি

২০২৬ আগস্ট ১৬ ১৯:২৩:১০
ঝালকাঠিতে অপপ্রচারের প্রতিবাদে বিএনপির সভা, তদন্ত ও জড়িতদের শাস্তির দাবি

এমদাদুল হক স্বপন, ঝালকাঠি : একজন যাত্রী। হাতে বাসের টিকিট। গন্তব্য ঢাকা। অথচ পথেই তাকে ‘চোর’ অপবাদ দিয়ে মারধর, অপহরণের চেষ্টার অভিযোগ এবং সেই ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে ঝালকাঠিতে। ভুক্তভোগী ওই যাত্রী হলেন নলছিটি উপজেলার ভৈরবপাশা ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. বেল্লাল হোসেন মৃধা। তার অভিযোগ, পূর্বপরিকল্পিতভাবে তাকে ফাঁসিয়ে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করতে একটি চক্র এ ঘটনা ঘটিয়েছে।

ঘটনার প্রতিবাদে আজ রবিবার সকালে ভৈরবপাশা ইউনিয়নের প্রতাপ বাজার বিএনপি কার্যালয়ে প্রতিবাদ সভা করেছে স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। সভা থেকে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, অপপ্রচারকারীদের শনাক্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।

‘চোর’ অপবাদ দিয়ে মারধরের অভিযোগ

বেল্লাল হোসেন মৃধার ভাষ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বরিশাল থেকে সোহাগ পরিবহনের একটি বাসে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন তিনি। তার অভিযোগ, বাসে সামনের একটি আসন খালি থাকলেও তাকে পেছনের আসনের টিকিট দেওয়া হয়। বরিশাল থেকে বাস ছাড়ার পর সামনের খালি আসনে বসার অনুরোধ করলে বাসের সুপারভাইজারের সঙ্গে তার কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে সুপারভাইজার তাকে সামনের স্টেশনে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন বলে দাবি করেন তিনি।

পরে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার ‘বরিশাল গেট’ নামক একটি হাইওয়ে রেস্টুরেন্টে বাসটি যাত্রাবিরতি করে। বেল্লালের দাবি, আশপাশের পরিস্থিতি নিয়ে আশঙ্কায় তিনি বাস থেকে নামেননি। এ সময় বাসটি প্রায় ফাঁকা হয়ে গেলে চালক, সুপারভাইজার, হেলপারসহ কয়েকজন তাকে ঘিরে ধরে ‘চোর’ আখ্যা দিয়ে মারধর করেন এবং তাকে অপহরণের চেষ্টা করা হয়।

তার চিৎকারে হাইওয়ে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে বলে জানান বেল্লাল। পরে তাকে চিকিৎসা দিয়ে মুকসুদপুর থানায় হস্তান্তর করা হয়।

যে ভিডিও নিয়ে প্রশ্ন

ঘটনার সময় বাসের কর্মচারীরা তাকে মারধরের পাশাপাশি একটি ব্লেড দেখিয়ে পাশের আসনের একটি ব্যাগ কাটার অভিযোগ তোলে বলে দাবি করেন বেল্লাল। পরে ওই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তার অভিযোগ, ভিডিওটি ভৈরবপাশা ইউনিয়নের কয়েকজন প্রতিদ্বন্দ্বী চেয়ারম্যান প্রার্থীর কাছে পাঠানো হয় এবং সেখান থেকে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে তাকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হয়েছে।

বেল্লালের দাবি, ভাইরাল ভিডিওতে ওই বাসে কোনো যাত্রী বা সংশ্লিষ্ট ব্যাগের মালিককে দেখা যায়নি। এমনকি যে ব্যাগ কাটার অভিযোগ তোলা হয়েছে, তার প্রকৃত মালিক কে—সেটিও স্পষ্ট নয়। এ কারণেই পুরো ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তিনি।

মুকসুদপুর থানায় করা মামলার বাদী নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বেল্লাল। তার ভাষ্য, বাসের কোনো যাত্রী বা কথিত ব্যাগের মালিককে বাদী না করে রেস্টুরেন্টের ম্যানেজারকে বাদী করা হয়েছে। এ বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন বলে দাবি তার।

তিন দিন পর আদালতে, জামিন

বেল্লাল হোসেন মৃধার দাবি, তাকে তিন দিন থানায় রাখার পর শনিবার দুপুরে গোপালগঞ্জ আদালতে পাঠানো হয়। আদালত মামলাটি পর্যালোচনা করে তাকে জামিন দেন বলে জানান তিনি।

তবে ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ সত্যতা নির্ধারণে বাসের সিসিটিভি ফুটেজ, যাত্রী তালিকা, টিকিটের তথ্য, কথিত ব্যাগের মালিক, বাসকর্মীদের বক্তব্য, হাইওয়ে পুলিশের ঘটনাস্থলের ভূমিকা এবং ভাইরাল ভিডিওটির উৎস তদন্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

‘মব’ করে কাউকে অপরাধী বানানোর অভিযোগ

প্রতিবাদ সভায় বক্তারা বলেন, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা যেতে পারে। কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে দলবদ্ধভাবে মারধর করে কাউকে ‘চোর’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং পরে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

সভায় ভৈরবপাশা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি সভাপতি মো. শহীদ খান, সাধারণ সম্পাদক মো. মানিক খান, ৫ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি মো. বাবুল হাওলাদার, ২ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি মো. আলমগীর হোসেন, সাধারণ সম্পাদক মো. ফোরকান হোসেন হাওলাদার, যুবদল নেতা আব্দুর রাজ্জাক মল্লিক, মোহাম্মদ জুয়েল হাওলাদার, মোহাম্মদ খোকন মাঝিসহ বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দেন।

বক্তারা বলেন, বেল্লাল হোসেন মৃধাকে ঘিরে অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্র চালানো হচ্ছে। যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো ভিডিও বা প্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য তারা সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানান।

‘আমি বিচার চাই’

বেল্লাল হোসেন মৃধা বলেন, “আমি কোনো অপরাধ করে থাকলে আইন অনুযায়ী আমার বিচার হোক। কিন্তু আমাকে মারধর করে, ‘চোর’ বানিয়ে ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে হেয়প্রতিপন্ন করার অধিকার কারও নেই। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রকৃত অপরাধীদের বিচার চাই।”

তিনি আরও বলেন, মুকসুদপুরের স্থানীয় সাংবাদিকদের মাধ্যমে ঘটনাটি ব্যাপকভাবে প্রচারিত না হলেও তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা ভিডিওটি ঝালকাঠির বিভিন্ন সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের কাছে ছড়িয়ে দিয়েছেন। এতে তার সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে দাবি করে তিনি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান।

একই সঙ্গে সোহাগ পরিবহনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রতিও তিনি আহ্বান জানিয়েছেন—বাসের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে যাত্রীকে দলবদ্ধভাবে মারধর, অপমান বা মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসানোর মতো কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

এ ঘটনায় বেল্লাল হোসেন মৃধার অভিযোগের বিষয়ে বাস কর্তৃপক্ষ, মামলার বাদী এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্তই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

(এমএস/এসপি/আগস্ট ১৬, ২০২৬)