প্রচ্ছদ » দেশের খবর » বিস্তারিত
স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে লাখো মানুষ
যশোরে লাইসেন্সবিহীন মিনারেল ওয়াটারের রমরমা বাণিজ্য
২০২৬ আগস্ট ২০ ১৫:৫৬:২০
#নামমাত্র ট্রেড লাইসেন্স চলছে সব
#জেলায় নামে বেনামে রয়েছে ২০০ থেকে ২২০ প্রতিষ্ঠান
# গড়ে প্রতিদিন বিক্রি হয় ৭ থেকে ১০ হাজার জার
স্বাধীন মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ, যশোর : যশোর জেলাজুড়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে অনুমোদনহীন ও অস্বাস্থ্যকর মিনারেল ওয়াটারের কারখানা। প্রক্রিয়াজাত পানির নামে বাসাবাড়ির সাবমারসিবল পাম্পের সাধারণ পানি জারে ভরে প্রতিনিয়ত বাজারজাত করছে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী। বিএসটিআই-এর নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে ও কোনো প্রকার মান নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই অবাধে চলছে এ রমরমা বাণিজ্য। যার ফলে জেলাজুড়ে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন লাখো সাধারণ মানুষ।
বিএসটিআই যশোর কার্যালয়ের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, সমগ্র যশোর জেলায় মাত্র ৩ টি প্রতিষ্ঠানের প্রক্রিয়াজাত পানি উৎপাদনের ও বাজারজাত করার বৈধ অনুমোদন রয়েছে। অথচ জেলার ৮টি উপজেলা—চৌগাছা, ঝিকরগাছা, বাঘারপাড়া, অভয়নগর, কেশবপুর, মনিরামপুর, শার্শা ও জেলা সদরের বিভিন্ন পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে দুই শতাধিক অবৈধ পানির কারখানা গড়ে উঠেছে। এসব কারখানার অধিকাংশই শুধু স্থানীয় পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নামমাত্র ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে বেআইনিভাবে জারের পানির ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব কারখানায় অত্যন্ত নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে জার ভর্তি করা হয়। যথাযথ ফিল্টারিং বা জীবাণুমুক্তকরণের বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই সাধারণ পানি নামমাত্র প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করা হচ্ছে। প্রতিটি জার ৩০ থেকে ৪০ টাকা দরে বিক্রি হয়। নামিদামি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন অফিস, ব্যাংক, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমনকি হোটেল ও চায়ের দোকানেও সরবরাহের সুবিধার্থে নিজস্ব বা ভাড়াটে যানবাহনে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে এই পানি। কোথাও কোথাও সপ্তাহে নির্দিষ্ট দিন বা মোবাইলে অর্ডার পেলেই জারের পানি পৌঁছে যাচ্ছে সরাসরি বাসাবাড়িতে।
চৌগাছা উপজেলার পৌর এলাকার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাকপাড়া এলাকায় প্রবাসী হারুন কবীর রুবেলের বাড়িতে সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, বাসা বাড়ির সাথেই পানির কারখানা গড়ে তুলেছেন তারা। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও সেমিপাকা ঘরের ভিতরে ছোট একটা স্টিলের ট্যাংকিসহ ঘরের ভিতরে ও বাইরে ৪টি প্লাস্টিকের ট্যাংকিতে পানি ধরে রাখছেন। পরবর্তীতে এই পানিতে ট্যাবলেট মিশিয়ে জারভর্তি করে বাজারে সরবরাহ করছেন।
প্রবাসী রুবেলের পরিবারের সাথে কথা বলে জানা যায় পৌরসভা থেকে একটা ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে তারা এই পানির ব্যবসা করছেন। বিএসটিআই বা পানির গুণাগুণ যাচাই এর কোনো ব্যবস্থা তাদের নাই। পরিবারের পুরুষ সদস্য না থাকাতে ছেলের স্ত্রী ও মা স্থানীয় মজুরদের দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে নিচ্ছেন।
অনুসন্ধান বলছে, পুরো জেলায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭ থেকে ১০ হাজার বোতল বা জার পানি সাধারণ ভোক্তার হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। অথচ বিধি অনুযায়ী যেকোনো জারজাত পানি বিক্রি করতে হলে বিএসটিআই-এর লাইসেন্স, ল্যাব টেস্ট রিপোর্ট এবং জারের মুখে বিএসটিআই-এর কিউআর কোড বা বিশেষ সিল ব্যবহার বাধ্যতামূলক। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রশাসন ও প্রভাবশালী মহলের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিংবা ছত্রছায়ায় এ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে চক্রটি। অনেকেই ভুয়া ও নকল সিল ব্যবহার করে বাজারজাত করছে। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তির ছত্রছায়ায় এমনকি অর্থায়নে দেদারসে চলছে এই ছোট বড় কারখানা।
নিরাপদ ভেবে প্রতিদিন এই পানি পান করছেন সাধারণ মানুষ। যা পানের মাধ্যমে অজান্তেই ডায়রিয়া, টাইফয়েড, জন্ডিসসহ নানা ধরনের ভয়াবহ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে। চিকিৎসকদের মতে, জীবন রক্ষাকারী পানি এখানে নীরবে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এ বিষয়ে বিএসটিআই যশোরের উপ-পরিচালক আসলাম শেখ জানান, পুরো জেলায় মাত্র ৩টি প্রতিষ্ঠানের বিএসটিআই অনুমোদিত বৈধ কাগজপত্র রয়েছে। এর বাইরে কোনো প্রতিষ্ঠানের পানি বাজারজাত করার অনুমতি নেই। তবে উপকূলীয় ও লবণাক্ত এলাকাগুলোতে জেলা প্রশাসকের অনুমতিক্রমে কিছু বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) ড্রিংকিং ওয়াটার প্ল্যান্ট চালাতে পারে। কিন্তু এর বাইরে যারা অবৈধভাবে বা নকল সিল ব্যবহার করে জারের পানি বিক্রি করছে, তাদের বিরুদ্ধে খবর পেলেই দ্রুত আইনানুগ অভিযান ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় অবিলম্বে এসব অবৈধ কারখানায় বিএসটিআই ও জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের কঠোর অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
(এসএ/এসপি/আগস্ট ২০, ২০২৬)
