ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬, ৫ ভাদ্র ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » পাঠকের লেখা » বিস্তারিত

মশার ছোট্ট হুল, বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি: প্রতিরোধে চাই সম্মিলিত অঙ্গীকার

২০২৬ আগস্ট ২০ ১৬:৪১:০৮
মশার ছোট্ট হুল, বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি: প্রতিরোধে চাই সম্মিলিত অঙ্গীকার

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ


প্রতি বছর ২০ আগস্ট বিশ্ব মশা দিবস পালিত হয়। ১৮৯৭ সালে ব্রিটিশ চিকিৎসাবিজ্ঞানী স্যার রোনাল্ড রস প্রমাণ করেন যে মশার মাধ্যমে ম্যালেরিয়ার জীবাণু মানুষের মধ্যে ছড়াতে পারে। তাঁর এই ঐতিহাসিক আবিষ্কার মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে আধুনিক জনস্বাস্থ্যের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। বিশ্ব মশা দিবস তাই কেবল একটি স্মরণীয় দিন নয়; বরং মশাবাহিত রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ এবং ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্ব স্মরণ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।

মশা আকারে ছোট হলেও জনস্বাস্থ্যের জন্য এর ঝুঁকি অত্যন্ত বড়। ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়া, ফাইলেরিয়া, জাপানিজ এনসেফালাইটিস ও জিকার মতো রোগ মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। এসব রোগের কারণে শুধু মৃত্যু নয়, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা, কর্মক্ষমতা হ্রাস, চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি এবং পরিবার ও অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়।

কেন মশা এত বিপজ্জনক?

মশা নিজে সবসময় রোগ সৃষ্টি করে না; আক্রান্ত মানুষ বা প্রাণী থেকে জীবাণু সংগ্রহ করে অন্য মানুষকে কামড়ানোর মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়িয়ে দেয়। কোন মশা কোন রোগের বাহক হবে, তা রোগভেদে ভিন্ন।

মশার বিস্তার বাড়ার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—

* জমে থাকা পানি: বালতি, ড্রাম, ফুলের টব, টবের নিচের প্লেট, পুরোনো টায়ার, বোতল, প্লাস্টিকের পাত্র, নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি মশার প্রজননের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে।

* উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া: তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও আর্দ্রতার পরিবর্তন মশার জীবনচক্র ও বিস্তারে প্রভাব ফেলতে পারে।

* অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ও নগরায়ণ: অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা, নির্মাণাধীন স্থানে পানি জমে থাকা এবং অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মশার প্রজনন বাড়ায়।

* অসচেতনতা: বাড়ির আশপাশে পানি জমতে দেওয়া, পানির পাত্র খোলা রাখা এবং নিয়মিত পরিষ্কার না করা মশার বংশবিস্তারের সুযোগ তৈরি করে।

বাংলাদেশে ২০২৬ সালের ডেঙ্গু পরিস্থিতি

বাংলাদেশে মশাবাহিত রোগের মধ্যে ডেঙ্গু বর্তমানে অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বিশেষ করে বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে এডিস মশার বিস্তার বাড়লে ডেঙ্গুর ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। ১৪ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যের ভিত্তিতে দেশে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মোট ২২ হাজার ৯৩৬ জন হাসপাতালে ভর্তি এবং ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। শুধু ১৪ আগস্টের আগের ২৪ ঘণ্টায় ৬৯৩ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি এবং দুজনের মৃত্যু হয়েছে। চট্টগ্রামেও চলতি বছরে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত ১ হাজার ১৯৫ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত এবং তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কয়েকটি ওয়ার্ডে এডিস মশার প্রজননঝুঁকিও বেশি পাওয়া গেছে।

অতীতের পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক। ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি এবং ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ফলে ২০২৬ সালের বর্তমান পরিস্থিতিকে কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।

মশাবাহিত প্রধান রোগ: বাহক, লক্ষণ ও জটিলতা

ডেঙ্গু

ডেঙ্গু ভাইরাস প্রধানত এডিস ইজিপ্টি ও এডিস অ্যালবোপিকটাস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। এডিস মশা দিনের বেলাতেও সক্রিয় থাকে এবং সাধারণত মানুষের বসতবাড়ির আশপাশের ছোট পানির আধারে বংশবিস্তার করে।

প্রধান লক্ষণ: হঠাৎ জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, মাংসপেশি ও জয়েন্টে ব্যথা, দুর্বলতা, বমি বমি ভাব এবং কখনো ত্বকে র‍্যাশ দেখা দিতে পারে।

গুরুতর অবস্থার সতর্কসংকেত: তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে অস্বাভাবিক রক্তপাত, অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্থিরতা বা ঘুমঘুম ভাব, শ্বাসকষ্ট এবং দ্রুত শারীরিক অবস্থার অবনতি গুরুতর ডেঙ্গুর সংকেত হতে পারে।

জটিলতা: গুরুতর ডেঙ্গুতে রক্তক্ষরণ, রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে কমে যাওয়া, শক এবং বিভিন্ন অঙ্গের কার্যকারিতা ব্যাহত হতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না হলে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে।

ডেঙ্গু সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। পর্যাপ্ত তরল ও বিশ্রাম গুরুত্বপূর্ণ। জ্বর কমাতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিবেন। নিজে থেকে ঔষধ ব্যবহার করা উচিত নয়।

চিকুনগুনিয়া

চিকুনগুনিয়া ভাইরাসও এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়।

লক্ষণ: হঠাৎ জ্বর, তীব্র জয়েন্ট ব্যথা, মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা, দুর্বলতা এবং কখনো র‍্যাশ।

জটিলতা: অনেক রোগীর ক্ষেত্রে তীব্র জয়েন্ট ব্যথা দীর্ঘদিন বা কয়েক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। ফলে স্বাভাবিক চলাফেরা ও দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হতে পারে। বর্তমানে এর নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই; উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়।

ম্যালেরিয়া

ম্যালেরিয়ার প্রধান বাহক অ্যানোফিলিস মশা। বাংলাদেশে বিশেষ করে পার্বত্য ও সীমান্তবর্তী কিছু এলাকায় ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি বেশি।

লক্ষণ: জ্বর, কাঁপুনি, মাথাব্যথা, ঘাম, দুর্বলতা এবং শরীর খারাপ লাগা।

জটিলতা: চিকিৎসা বিলম্বিত হলে গুরুতর ম্যালেরিয়া হতে পারে। এতে মস্তিষ্ক, কিডনি, লিভারসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি মারাত্মক রক্তস্বল্পতা ও অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে। দ্রুত পরীক্ষা ও সঠিক চিকিৎসা জীবন রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে ২০২৪ সালে বিশ্বে আনুমানিক ২৮ কোটি ২০ লাখ মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত এবং প্রায় ৬ লাখ ১০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

ফাইলেরিয়া

ফাইলেরিয়া বা গোদ রোগ নির্দিষ্ট প্রজাতির মশার মাধ্যমে ছড়ানো পরজীবীজনিত রোগ।

লক্ষণ: লসিকা নালির ক্ষতি, হাত-পা বা শরীরের কোনো অংশ অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাওয়া এবং আক্রান্ত স্থানে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন।

জটিলতা: দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অক্ষমতা, চলাফেরায় সমস্যা, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং সামাজিক ও মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। জাপানিজ এনসেফালাইটিস। জাপানিজ এনসেফালাইটিস সাধারণত কিউলেক্স মশার মাধ্যমে ছড়ায়।

লক্ষণ:জ্বর, মাথাব্যথা, বমি, আচরণগত পরিবর্তন, খিঁচুনি ও স্নায়বিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।

জটিলতা: গুরুতর ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে প্রদাহ, দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক অক্ষমতা, পক্ষাঘাত এবং মৃত্যু হতে পারে।

মশার প্রজনন বন্ধ করাই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ

মশা নিয়ন্ত্রণে শুধু ফগিংয়ের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। মশার ডিম ও লার্ভার উৎস ধ্বংস করাই দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি।

‘সপ্তাহে এক দিন, ১০ মিনিট’ মশা অনুসন্ধান

প্রতি সপ্তাহে অন্তত এক দিন বাড়ির ভেতর ও বাইরে ১০ মিনিট সময় নিয়ে মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল খুঁজে দেখতে হবে।

ফুলের টব, টবের নিচের প্লেট, বালতি, ড্রাম, পুরোনো টায়ার, বোতল, ছাদ, নির্মাণসামগ্রী, পরিত্যক্ত পাত্র ও অন্যান্য স্থানে পানি জমে আছে কি না দেখতে হবে। পানি ফেলে দেওয়ার পাশাপাশি পাত্রের ভেতরের অংশ ঘষে পরিষ্কার করা প্রয়োজন, কারণ মশার ডিম পাত্রের গায়ে লেগে থাকতে পারে।

ব্যক্তিগত সুরক্ষা

এডিস মশা দিনের বেলাতেও কামড়াতে পারে। তাই শুধু রাতে মশারি ব্যবহার যথেষ্ট নয়।
বাইরে গেলে শরীর যতটা সম্ভব ঢেকে রাখা, দরজা-জানালায় মশা প্রতিরোধী জালি ব্যবহার এবং অনুমোদিত মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করা যেতে পারে। শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।

ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকেও মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত রাখা জরুরি। রোগীর শরীরে থাকা ভাইরাস মশার মাধ্যমে অন্য মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই অসুস্থ অবস্থায় রোগীকে মশারির মধ্যে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

ফগিংয়ের পাশাপাশি লার্ভা নিয়ন্ত্রণ

ফগিং মূলত প্রাপ্তবয়স্ক মশা কমাতে সহায়তা করে; কিন্তু মশার ডিম ও লার্ভার উৎস ধ্বংস না করলে নতুন মশা তৈরি হতে থাকবে। তাই বৈজ্ঞানিক জরিপের ভিত্তিতে উৎসস্থল ধ্বংস, প্রয়োজন অনুযায়ী লার্ভিসাইড এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে ফগিং—সবগুলোকে সমন্বিতভাবে ব্যবহার করতে হবে।

সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় প্রশাসনের উচিত নিয়মিত লার্ভা জরিপ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্তকরণ, উৎসস্থল ধ্বংস এবং মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের ফলাফল মূল্যায়ন করা।

কখন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে?

জ্বর হলেই ডেঙ্গু—এমন নয়। আবার সাধারণ জ্বর ভেবে ডেঙ্গুকে অবহেলা করাও বিপজ্জনক। তাই জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়া উচিত।

বিশেষ করে জ্বরের সঙ্গে তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, অস্বাভাবিক রক্তপাত, অতিরিক্ত দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব, অস্থিরতা বা দ্রুত অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে হবে।

ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জ্বর হলে দ্রুত পরীক্ষা করা প্রয়োজন, কারণ ম্যালেরিয়ার প্রাথমিক লক্ষণ অন্যান্য জ্বরের মতো হতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও নগরায়ণ নতুন চ্যালেঞ্জ

জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ, ঘনবসতি, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ, জলাবদ্ধতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণকে আরও কঠিন করে তুলছে।
ভবিষ্যতে শুধু রোগী শনাক্ত হওয়ার পর ব্যবস্থা নিলে চলবে না। বরং প্রাক-মৌসুমি প্রস্তুতি নিতে হবে। মশার ঘনত্ব পর্যবেক্ষণ, নিয়মিত লার্ভা জরিপ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ, রোগের নজরদারি, হাসপাতালের প্রস্তুতি এবং দ্রুত চিকিৎসা ব্যবস্থাকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।

ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের করণীয়

মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে তিনটি স্তরে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

ব্যক্তি পর্যায়ে: বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা, জমে থাকা পানি অপসারণ, পানির পাত্র ঢেকে রাখা, মশারি ব্যবহার এবং মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত থাকা।

সামাজিক পর্যায়ে: মহল্লা, স্কুল, মাদ্রাসা, বাজার, অফিস ও নির্মাণাধীন ভবনে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা এবং স্থানীয়ভাবে মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে দ্রুত অপসারণ করা।

রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে: সঠিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মশা জরিপ, লার্ভা নিয়ন্ত্রণ, প্রয়োজনীয় ফগিং, ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, হাসপাতালের প্রস্তুতি এবং গণসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা।

হোমিওপ্যাথিক ব্যবস্থাপনা

মশাবাহিত রোগ বর্তমানে জনস্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়াসহ বিভিন্ন রোগ মশার মাধ্যমে মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। বর্ষাকাল ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে মশার প্রজননস্থল বৃদ্ধি পাওয়ায় এসব রোগের প্রকোপও বাড়তে পারে। রোগ প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা, মশার বংশবিস্তার রোধ এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষার পাশাপাশি অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার অন্যতম মূলনীতি হলো—‘রোগ নয়, রোগীকে চিকিৎসা করা।’ এই পদ্ধতিতে রোগীর সামগ্রিক শারীরিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্য, রোগের ধরন, জ্বরের প্রকৃতি, ব্যথা, দুর্বলতা, তৃষ্ণা, ঘামসহ ব্যক্তিভেদে বিভিন্ন উপসর্গ বিবেচনা করে ওষুধ নির্বাচনের কথা বলা হয়। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকেরা রোগীর উপসর্গের সামগ্রিক চিত্র অনুযায়ী বিভিন্ন ওষুধ বিবেচনা করে থাকেন। মশাবাহিত জ্বর বা জ্বর-পরবর্তী বিভিন্ন উপসর্গের ক্ষেত্রে হোমিওপ্যাথিক সাহিত্যে প্রচলিতভাবে যেসব ওষুধের নাম পাওয়া যায়, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—ইউপেটোরিয়াম পারফোলিয়েটাম, জেলসেমিয়াম,ব্রায়োনিয়া, রাস টক্সিকোডেনড্রন, বেলাডোনা, চায়না অফিসিনালিস, আর্সেনিকাম অ্যালবাম, নাক্স ভোমিকা, ফসফরাস, আকোনাইটাম ন্যাপেলাস, ফেরাম ফসফোরিকাম, আর্নিকা মন্টানা, পালসাটিলা, ক্যালি কার্বোনিকাম, লাইকোপোডিয়াম, সালফার, কার্বো ভেজিটেবিলিস, ক্যামোমিলা, আর্জেন্টাম নাইট্রিকাম, সেপিয়া। তবে হোমিওপ্যাথির মূলনীতিতেই ব্যক্তিভেদে ওষুধ নির্বাচনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। অর্থাৎ একই ধরনের জ্বর বা উপসর্গ দেখা দিলেই সবার জন্য একই ওষুধ প্রযোজ্য—এমন ধারণা হোমিওপ্যাথিক পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই উপরোক্ত নামগুলোকে সাধারণ তালিকা হিসেবে দেখা উচিত; নির্দিষ্ট রোগীর জন্য ওষুধ ও চিকিৎসা-পদ্ধতি নির্ধারণ করবেন যোগ্য চিকিৎসক।

* হোমিওপ্যাথি ও নিরাপদ চিকিৎসা: হোমিওপ্যাথির মাধ্যমে উপসর্গভিত্তিক সহায়তা নেওয়ার কথা কেউ বিবেচনা করলে তা অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শে করা উচিত।

* বিশেষ করে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া বা অন্য কোনো গুরুতর সংক্রমণের সন্দেহ থাকলে রোগ নির্ণয়, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

* ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব বা অস্থিরতার মতো বিপদসংকেত দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। এসব পরিস্থিতিতে কোনো পরিপূরক চিকিৎসার কারণে মূল চিকিৎসা বিলম্বিত করা উচিত নয়।

আমাদের অঙ্গীকার থাকা প্রয়োজন

১. সপ্তাহে অন্তত এক দিন বাড়ির আশপাশে মশার প্রজননস্থল খুঁজে ধ্বংস করব।

২. কোনো পাত্রে অপ্রয়োজনে পানি জমতে দেব না।

৩. পানি সংরক্ষণের পাত্র ঢেকে রাখব।

৪. পুরোনো টায়ার, বোতল ও প্লাস্টিকের পাত্র অপসারণ করব।

৫. ছাদ, বারান্দা ও ফুলের টব নিয়মিত পরীক্ষা করব।

৬. দিনের বেলাতেও এডিস মশার কামড় থেকে নিজেকে রক্ষা করব।

৭. ডেঙ্গু রোগীকে মশার কামড় থেকে নিরাপদ রাখব।

৮. জ্বর হলে নিজের মতো করে ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেব।

৯. গুরুতর সতর্কসংকেত দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যাব।

১০. স্কুল, মাদ্রাসা, অফিস ও কর্মস্থলে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশ নেব।

১১. স্থানীয় প্রশাসনের মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে সহযোগিতা করব।

১২. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব নয়, যাচাই করা স্বাস্থ্যতথ্য প্রচার করব।

পরিশেষে বলা যায়, বিশ্ব মশা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মশাবাহিত রোগের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল হাসপাতাল বা চিকিৎসকের দায়িত্ব নয়; এটি প্রতিটি পরিবার ও নাগরিকের দায়িত্ব। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা গেলে রোগের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

২০২৬ সালের ডেঙ্গু পরিস্থিতি আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। অতীতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা এবং চলতি বছরের ক্রমবর্ধমান রোগীর সংখ্যা দেখিয়ে দিচ্ছে, মশা নিয়ন্ত্রণে মৌসুমি ও খণ্ডকালীন উদ্যোগের পরিবর্তে সারা বছরব্যাপী পরিকল্পিত কর্মসূচি প্রয়োজন।

মশা নিয়ন্ত্রণে শুধু কীটনাশক বা ফগিংয়ের ওপর নির্ভর করলে হবে না। প্রয়োজন পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, জমে থাকা পানি অপসারণ, নিয়মিত নজরদারি, ব্যক্তিগত সুরক্ষা, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং কার্যকর সরকারি উদ্যোগের সমন্বয়।তাই বিশ্ব মশা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—জমে থাকা পানি রাখব না, মশার প্রজননস্থল হতে দেব না, মশার কামড় থেকে নিজেকে রক্ষা করব এবং অন্যকেও সচেতন করব।মনে রাখতে হবে, মশা ছোট হলেও এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দায়িত্ব ছোট নয়। সচেতন একটি পরিবার, পরিচ্ছন্ন একটি মহল্লা এবং দায়িত্বশীল একটি রাষ্ট্রই পারে মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি কমিয়ে একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে।

লেখক: কলাম লেখক ও গবেষক।