প্রচ্ছদ » দেশের খবর » বিস্তারিত
তিন তদন্তে দুই চিত্র
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ফল জালিয়াতির মামলায় পুলিশের চার্জশিটে বড় গরমিল
২০২৬ আগস্ট ২৫ ১৮:৩৯:০২
জে.জাহেদ, চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় এক কর্মকর্তার ছেলের ফলাফল জালিয়াতির অভিযোগের মামলায় পুলিশের সর্বশেষ চার্জশিটে চারজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তদন্তে বলা হয়েছে, উত্তরপত্র ও নম্বর ফর্দ পর্যালোচনায় প্রকৃত নম্বরের তুলনায় অতিরিক্ত নম্বর দেওয়ার প্রমাণ মিলেছে। শিক্ষা অধিদপ্তরের উচ্চপর্যায়ের তদন্তেও ফল জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল এবং পরে নক্ষত্র দেবনাথের ফল, সনদ ও একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট বাতিল করা হয়েছে।
কিন্তু মামলার নথিপত্র একসঙ্গে পর্যালোচনা করলে সামনে আসে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন—ফলাফল জালিয়াতির মূল ঘটনার সূত্রপাত হিসেবে যে ১২টি পত্রের পুনঃনিরীক্ষণের আবেদনকে ঘিরে রহস্য তৈরি হয়েছিল, সেটি আসলে কে করেছিল—তিন দফা তদন্তের পরও কি সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেছে? নথি বলছে, না।
বরং পাঁচলাইশ থানার জিডি তদন্ত এবং পরে কাউন্টার টেরোরিজম বিভাগের সাইবার তদন্ত—দুই ক্ষেত্রেই আবেদনকারীকে শনাক্ত করা যায়নি। অথচ পরবর্তী মূল মামলার অভিযোগপত্রে ফল জালিয়াতির ঘটনায় চারজনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর সপক্ষে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ ও ডিজিটাল আলামতের উল্লেখ কতটা রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ফলে প্রশ্ন উঠছে, মূল ফল জালিয়াতির তদন্তে কোন প্রমাণগুলো নিশ্চিতভাবে আসামিদের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে এবং কোন বিষয়গুলো অনুমান, পারিপার্শ্বিকতা বা আগের তদন্তের ওপর নির্ভর করে নেওয়া হয়েছে? নথি বিশ্লেষণে আরও পাওয়া যাচ্ছে—চার্জশিটে বেশ কিছু তারিখগত অসঙ্গতি, তদন্তের ধারাবাহিকতায় প্রশ্ন এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান অসম্পূর্ণ থাকার আলামত রয়েছে।
শুরুটা ১২ খাতার আবেদন দিয়ে
২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় নক্ষত্র দেবনাথ জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। তার রোল নম্বর ১০৮৫৫৪ এবং রেজিস্ট্রেশন নম্বর ১৮১৪৭০৬৯৩৮। ফল প্রকাশের পর কয়েকটি বিষয়ে নম্বর কাঙ্ক্ষিত না হওয়ায় পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করতে গিয়ে পরিবার জানতে পারে—আগেই তার ছয়টি বিষয়ের প্রথম ও দ্বিতীয় পত্র মিলিয়ে মোট ১২টি পত্রের পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করা হয়েছে।
এ ঘটনায় নক্ষত্রের মা বনশ্রী নাথ ৪ ডিসেম্বর ২০২৩ পাঁচলাইশ থানায় জিডি করেন। জিডি নম্বর ৩৩৫। জিডিতে তিনি বিষয়টিকে সন্দেহজনক উল্লেখ করে আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এর পেছনে কোনো কুচক্রী মহলের পরিকল্পনা থাকতে পারে। এরপর শুরু হয় পুলিশের তদন্ত।
জিডি তদন্ত: আবেদনকারী ‘অজ্ঞাতই’ রয়ে গেল
জিডির তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন পাঁচলাইশ থানার এসআই মো. রেজাউল করিম। তিনি আদালতের অনুমতি নিয়ে টেলিটক ও চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন। তদন্তে বেরিয়ে আসে, ২৮ নভেম্বর ২০২৩ রাত ৮টা ১৩ মিনিটে টেলিটক নম্বর ০১৫৩১-৫৮০৬৯৮ থেকে নক্ষত্রের ১২ পত্রের পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করা হয়। রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা হয় বাংলালিংক নম্বর ০১৯১৩-০২০৭৪৩।
আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য—টেলিটক নম্বরটি নিবন্ধিত ছিল মামুনুর রহমান মামুনের নামে। তদন্তে জানা যায়, নম্বরটি ব্যবহার করা হতো চকবাজারের ‘চকরিয়ার কম্পিউটার’ নামের দোকানে।
অন্যদিকে রেফারেন্স নম্বরটি ছিল চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল আলীমের নামে নিবন্ধিত। কিন্তু তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এসে রহস্য থেকেই যায়। দোকানের মালিক মামুনুর রহমান পুলিশকে জানান, প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ তার দোকানে অনলাইন আবেদন করতে আসেন। ওই নির্দিষ্ট আবেদনটি কে করেছিলেন, তা তার মনে নেই। দোকানে সিসিটিভিও ছিল না। অর্থাৎ— যে ব্যক্তি ১২টি পত্রের পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করেছিলেন, তাকে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।
অবস্থান মিললেও সাক্ষ্য প্রমাণ নেই
জিডি তদন্তে কল ডিটেইল রেকর্ড বা সিডিআর বিশ্লেষণ করা হয়। তাতে দেখা যায়, আবেদন করার সময় টেলিটক নম্বরের ব্যবহারকারীর অবস্থান ছিল চট্টগ্রামে—চকবাজার এলাকার আশপাশে।
আর রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত আবদুল আলীমের নম্বরের অবস্থান ছিল উত্তরা, ঢাকা।
অর্থাৎ, আবদুল আলীমের নম্বর রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হলেও তদন্তে পাওয়া অবস্থান-তথ্য তাকে সরাসরি আবেদনকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেনি। বরং জিডির তদন্ত প্রতিবেদনের শেষ সিদ্ধান্ত ছিল—আবেদনকারী শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি এবং আবদুল আলীমের সরাসরি সম্পৃক্ততার পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তারপর সাইবার মামলা—কিন্তু ফল একই
জিডির পর বনশ্রী নাথ সাইবার ট্রাইব্যুনালে পিটিশন মামলা করেন। মামলা নম্বর ৫২/২০২৪। ধারা ছিল সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩-এর ১৮/২৪/২৬/৩৩। আসামি করা হয় আবদুল আলীম ও মুহাম্মদ ইদ্রিস আলীসহ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের। এবার তদন্তে নামে সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম বিভাগ।
তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন পুলিশ পরিদর্শক সঞ্জয় গুহ। প্রতিবেদন দাখিল করা হয় ১৫ জুলাই ২০২৪।
তদন্তে ফেসবুকের ‘Alex Alim’ এবং ‘Edris Ali’ আইডি থেকে পোস্ট দেওয়ার সত্যতা পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। আইটি ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমেও পোস্টের সত্যতা যাচাই করা হয়েছিল। কিন্তু এখানেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— নক্ষত্রের ১২ পত্রের পুনঃনিরীক্ষণের আবেদনটি আবদুল আলীম বা ইদ্রিস আলী করেছিলেন—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তদন্ত কর্মকর্তার প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়, যে কেউ কারও রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর জানলে টেলিটক নম্বর ব্যবহার করে পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করতে পারেন এবং অন্য কারও নম্বর রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। ফলে আবেদনটির প্রকৃতকারী শনাক্ত না হওয়ায় ১৮/২৪/২৬/৩৩ ধারার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়নি।
তাহলে ফেসবুক পোস্টে অপরাধের প্রমাণ, কিন্তু ১২ খাতার আবেদনে নয়
সাইবার তদন্তের শেষ পর্যায়ে তদন্ত কর্মকর্তা অবশ্য অন্য একটি অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পান।
তার মতে, আবদুল আলীম ও মুহাম্মদ ইদ্রিস আলী নক্ষত্রের পরিবারকে আক্রমণাত্মক, অপমান, হেয়প্রতিপন্ন ও মানহানি করার উদ্দেশ্যে ফেসবুকে পোস্ট/শেয়ার করেছেন। সেই কারণে তাদের বিরুদ্ধে সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩-এর ২৫(২)/২৯ ধারায় অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায় বলে মত দেওয়া হয়। অর্থাৎ দুই তদন্তের ফলাফল দাঁড়াল—১২ খাতার পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন কে করেছিল তা অমীমাংসিত। ফেসবুকে কারা পোস্ট করেছিল—তা তদন্তে শনাক্ত।
এরপর আসে মূল ‘ফল জালিয়াতি’ মামলা
২১ জানুয়ারি ২০২৫ চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক ড. এ কে এম সামছু উদ্দিন আজাদ বাদী হয়ে পাঁচলাইশ থানায় মামলা করেন। তাতে আসামি করা হয় চারজনকে—১. অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র নাথ ২. কিবরিয়া মাসুদ খান ৩. নক্ষত্র দেবনাথ ৪. অধ্যাপক মুস্তফা কামরুল আখতার। এই চারজনের বিরুদ্ধে মামলার তথ্য এসেছে। পরে এই মামলায় নারায়ণ চন্দ্র নাথ ও কিবরিয়া মাসুদ খানকে কারাগারে পাঠানোর হয়। পরে তারা জামিনে বের হন।
শিক্ষা অধিদপ্তরের তদন্ত বনাম থানা পুলিশের তদন্ত
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। শিক্ষা অধিদপ্তরের তিন সদস্যের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি সরেজমিন তদন্ত, কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং নথিপত্র পর্যালোচনা করে মত দেয়—নারায়ণ চন্দ্র নাথ কর্তৃক নিজের সন্তান নক্ষত্র দেবনাথের ফলাফল জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত। এই তদন্তের পর নক্ষত্রের ফল, সনদ ও একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট বাতিল করা হয়। অর্থাৎ ফলাফল নিয়ে প্রশ্নটি নিছক গুজব ছিল না; প্রশাসনিক তদন্তে গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার কথা নথিতে রয়েছে।
কিন্তু ফৌজদারি মামলায় কে, কীভাবে, কোন কম্পিউটার/সার্ভার/ইউজার অ্যাকাউন্ট থেকে কোন নম্বর পরিবর্তন করল—এই ‘ডিজিটাল চেইন অব ইভিডেন্স’ কতটা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে? এখানেই চার্জশিট নিয়ে অনুসন্ধানের বড় ফারাক তৈরি হয়।
চার্জশিটে ‘ডিজিটাল প্রমাণ’ কোথায়?
সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা এসআই এসএম সফিউল আজম মুন্সীর চার্জশিটে বলা হয়েছে—কিবরিয়া মাসুদ খান ফলাফল প্রস্তুতের টেকনিক্যাল কাজে যুক্ত ছিলেন। তিনি অফিসের স্বাভাবিক কার্যক্রম শেষে কম্পিউটার সেলে একাকী কাজ করতেন বলে সাক্ষীদের বক্তব্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
চার্জশিটে আরও বলা হয়েছে, নারায়ণ চন্দ্র নাথের নির্দেশে কিবরিয়া ফলাফলের ডিজিটাল রেকর্ড পরিবর্তন করে সার্ভারে আপলোড ও প্রকাশে সহযোগিতা করেন।
কিন্তু অনুসন্ধানের প্রশ্ন হলো—কোন নির্দিষ্ট কম্পিউটার? কোন ইউজার আইডি? কোন লগইন? কোন আইপি অ্যাড্রেস? কোন সার্ভার লগ? কোন তারিখ ও সময়ে পরিবর্তন? পরিবর্তনের আগে ও পরে ডাটাবেজে কী ছিল? কোন সফটওয়্যার বা সিস্টেম ব্যবহার করা হয়েছিল? কিবরিয়া মাসুদের ব্যবহৃত কম্পিউটার বা অ্যাকাউন্ট থেকে পরিবর্তনের ফরেনসিক প্রমাণ কী? চার্জশিটের বর্ণনায় এসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর স্পষ্টভাবে পাওয়া যায় না। বরং বড় অংশজুড়ে রয়েছে সাক্ষীদের বক্তব্য, পদমর্যাদা, পারিপার্শ্বিকতা এবং পূর্বের তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর নির্ভরতা। এখানেই তদন্তের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি হয়।
উত্তরপত্রই সবচেয়ে শক্তিশালী আলামত—কিন্তু নম্বর কে বদলাল?
চার্জশিটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো নক্ষত্রের উত্তরপত্র ও নম্বর ফর্দ জব্দ। আদালতের আদেশে ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের অফিস থেকে এগুলো জব্দ করেন দ্বিতীয় তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. মনিরুল ইসলাম। চার্জশিটে বলা হয়েছে, উত্তরপত্র ও নম্বর ফর্দ পর্যালোচনায় বিভিন্ন বিষয়ে প্রকৃত নম্বরের তুলনায় অতিরিক্ত নম্বর দেওয়া হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ আলামত।
কিন্তু এখানেও দুটি আলাদা প্রশ্ন: প্রথমত, নম্বর বেশি দেওয়া হয়েছিল কি না। দ্বিতীয়ত, সেই বেশি নম্বর কে, কখন এবং কীভাবে দিয়েছিল। প্রথম প্রশ্নের উত্তর তদন্তে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। কিন্তু দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরই ফৌজদারি দায় নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। চার্জশিটে এই দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর কতটা বৈজ্ঞানিক ও প্রত্যক্ষ প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এটাই বড় অনুসন্ধানের বিষয়।
চার্জশিটের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা: ‘কার মাধ্যমে’ নয়, ‘কার সঙ্গে’ বেশি জোর
চার্জশিটের যুক্তিতে নারায়ণ চন্দ্র নাথের সঙ্গে তার ছেলে নক্ষত্রের সম্পর্ক এবং তার দায়িত্বের অবস্থানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিবরিয়া মাসুদের টেকনিক্যাল দায়িত্বের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
এরপর দুই বিষয়কে মিলিয়ে বলা হয়েছে—তারা যোগসাজশে ফলাফল পরিবর্তন করেছেন। কিন্তু একজন তদন্ত কর্মকর্তার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হওয়া উচিত ছিল—অভিযোগিত ডিজিটাল পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট কারিগরি পথটি চিহ্নিত করা।
অর্থাৎ—ডেটা পরিবর্তন → ব্যবহারকারী → ডিভাইস → লগ → সার্ভার → সময় → কমান্ড/প্রক্রিয়া → ফলাফল প্রকাশ। এই চেইনের প্রতিটি ধাপ যদি ফরেনসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে সাক্ষ্য ও পারিপার্শ্বিকতার ওপর নির্ভরতা বাড়ে। চার্জশিটে সেই পূর্ণ ডিজিটাল চেইন স্পষ্ট নয়।
আরও বড় প্রশ্ন: ১২ খাতার আবেদন তদন্তে কেন শেষ হলো না?
এখানেই পুরো মামলার সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা। কারণ ১২টি পত্রের পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন ছিল প্রথম দৃশ্যমান অস্বাভাবিকতা। জিডি তদন্তকারী এসআই রেজাউল করিম সেই ঘটনার তদন্ত করেন।
তিনি টেলিটক নম্বর বের করেন। দোকান শনাক্ত করেন। রেফারেন্স নম্বর শনাক্ত করেন। সিডিআর সংগ্রহ করেন। এসএমএস কনটেন্ট সংগ্রহ করেন।
দোকানের মালিককে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। আবদুল আলীমকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। শেষ পর্যন্ত আবেদনকারী শনাক্ত হয়নি। পরে সাইবার তদন্তেও বিষয়টি আসে। সেখানেও আবেদনকারী শনাক্ত হয়নি। তাহলে মূল মামলার তদন্তে কি সেই ‘অজ্ঞাত আবেদনকারী’কে শনাক্ত করার জন্য নতুন করে কোনো গভীর অনুসন্ধান হয়েছে? চার্জশিটের বর্ণনা থেকে তার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় না।
তিন তদন্ত, তিন ধরনের ফল—এক জায়গায় মিল নেই
১২ পত্রের আবেদন এর বিষয়টি জিডিতেও তদন্ত হয়েছে। সাইবার তদন্তেও অনুসন্ধানে এসেছে। আবার মূল মামলার চার্জশিটে আবার মূল অভিযোগের সঙ্গে সরাসরি চূড়ান্তভাবে যুক্ত নয়। আবেদনকারীকে জিডি তদন্তে সনাক্ত হয়নি। সাইবার তদন্তেও সনাক্ত হয়নি। আবার মূল মামলার চার্জশিটেও নির্দিষ্ট নয়।
আবদুল আলীমের ভূমিকা জিডি তদন্তে সরাসরি প্রমাণিত নয়। সাইবার তদন্ত বলছে ১২ পত্রের আবেদনে সম্পৃক্ততা প্রমাণিত নয়। মূল মামলার চার্জশিট বলছে উনি মূল চার্জশিটের আসামি নন। ফেসবুক পোস্ট জিডি তদন্তে প্রাসঙ্গিক, সাইবার মামলা তদন্তে পোস্টের সত্যতা পাওয়া যায়। মূল মামলার চার্জশিট বলছে আবার এটি মামলার কেন্দ্রীয় বিষয় নয়।
এছাড়াও জিডি তদন্তে উত্তরপত্র/নম্বর ফর্দের ফলাফল বলছে এটি মূল তদন্তের বিষয় নয়। সাইবার তদন্ত বলছে কিছুই নয়। কিন্তু মূল মামলা তদন্তে এটি ছিলো প্রধান আলামত। ফলাফল পরিবর্তনের বিষয়ে পূর্বের জিডি তদন্ত বলছে পরবর্তী পর্যায়ের অভিযোগ নয়। সাইবার মামলা তদন্ত বলছে নয়। কিন্তু মূল মামলা তদন্তে চার আসামির বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ এনেছে কিভাবে। ডিজিটাল পরিবর্তনের ফরেনসিক চেইন জিডি তদন্তে নেই। সাইবার মামলা তদন্তেও নেই। মূল মামলা তদন্তে চার্জশিটে আবার বিস্তারিত স্পষ্ট নয়।
চতুর্থ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ—‘ব্যবস্থা নিন’ কতটা অপরাধের প্রমাণ?
অধ্যাপক মুস্তফা কামরুল আখতারের বিরুদ্ধে চার্জশিটের অন্যতম ভিত্তি হলো নক্ষত্রের স্বহস্তে লেখা আবেদনের ওপর ৪ ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখে তার লেখা ‘ব্যবস্থা নিন’ নির্দেশনা। এরপর পরীক্ষা নিয়ন্ত্রককে বিষয়টি বিবেচনা করতে বলা হয়। চার্জশিট এই ঘটনাকে ফল জালিয়াতির ধারাবাহিকতার সঙ্গে যুক্ত করেছে।
কিন্তু স্বতন্ত্র দৃষ্টিতে এখানে দুটি বিষয় আলাদা করা জরুরি—কোনো আবেদনপত্রে ‘ব্যবস্থা নিন’ লেখা এবং পরবর্তীতে পরীক্ষার নম্বর পরিবর্তন করা—দুটি স্বতন্ত্র ঘটনা। দুটির মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র প্রমাণ করতে হলে আরও শক্ত প্রমাণ দরকার। যেমন—নির্দেশনার পর কে কী করেছে, সেই নির্দেশনা ফলাফল পরিবর্তনের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হলো, নির্দেশদাতার জ্ঞাতসারে কী নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল—এসব। চার্জশিটে এই সংযোগটি মূলত পারিপার্শ্বিকতা ও সাক্ষ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে। যা দায়সারা ভাব।
তবে পুলিশের চার্জশিট কী ‘ভিত্তিহীন’?
এখানে ভারসাম্যপূর্ণ একটি বিষয়ও সামনে রাখতে হবে। চার্জশিটের পক্ষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো— নক্ষত্রের উত্তরপত্র; নম্বর ফর্দ; প্রকৃত ও পরিবর্তিত নম্বরের পার্থক্য; শিক্ষা অধিদপ্তরের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত; সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্বের অবস্থান; সাক্ষীদের বক্তব্য; ফলাফল বাতিলের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। সুতরাং ফলাফলে গুরুতর অনিয়ম হয়েছিল—এই প্রশ্ন এবং কারা সেই অনিয়ম করেছে—এই প্রশ্নকে এক করে দেখা যাবে না। প্রথমটির পক্ষে নথিতে শক্ত উপাদান আছে। দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে চার্জশিটের প্রমাণের গভীরতা আলাদা করে যাচাই করা প্রয়োজন।
‘দায়সারা চার্জশিট’—নাকি অসম্পূর্ণ তদন্ত?
নথি বিশ্লেষণে সরাসরি বলা কঠিন যে তদন্ত কর্মকর্তা ইচ্ছাকৃতভাবে দায়সারা চার্জশিট দিয়েছেন। তবে বলা যায়—চার্জশিটে এমন কয়েকটি অনুসন্ধানী ঘাটতি রয়েছে, যেগুলো আদালতে প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। বিশেষ করে: ১. ১২ পত্রের পুনঃনিরীক্ষণের আবেদনকারী শনাক্ত হয়নি। ২. আবেদনকারীকে শনাক্ত করতে আরও গভীর ডিজিটাল ফরেনসিক অনুসন্ধানের বিবরণ নেই। ৩. ফলাফল পরিবর্তনের নির্দিষ্ট কম্পিউটার/ইউজার/আইপি/সার্ভার লগের সুনির্দিষ্ট উল্লেখ নেই। ৪. কে কোন নম্বর কখন পরিবর্তন করেছে—তার সুনির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত টাইমলাইন স্পষ্ট নয়। ৫. উত্তরপত্রে অতিরিক্ত নম্বর দেওয়ার প্রমাণ এবং ডিজিটাল ফলাফল পরিবর্তনের মধ্যে সুনির্দিষ্ট যোগসূত্র আরও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন ছিল।
৬. চতুর্থ আসামির ‘ব্যবস্থা নিন’ নির্দেশনার সঙ্গে পরবর্তী ফল জালিয়াতির সরাসরি কার্যকর যোগসূত্র যথেষ্ট স্পষ্ট নয়। ৭. চার্জশিটে একাধিক তারিখগত অসঙ্গতি রয়েছে। ৮. ধারার উল্লেখেও টাইপোগ্রাফিক ভুল রয়েছে। ৯. আগের দুই তদন্তে যে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি, মূল তদন্তে সেটি পুনরায় গভীরভাবে অনুসন্ধান করা হয়েছে কি না, চার্জশিটে স্পষ্ট নয়।
সবচেয়ে বড় রহস্য: ফল জালিয়াতি প্রমাণিত, কিন্তু ‘ডিজিটাল হাত’ কোথায়?
এই মামলার নথি বিশ্লেষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানী প্রশ্নটি হলো—নক্ষত্রের প্রকৃত নম্বর বেশি করে দেওয়া হয়েছিল—এটি তদন্তে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে নথিতে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু সেই অতিরিক্ত নম্বর কে বসিয়েছিল, কখন বসিয়েছিল এবং কোন সিস্টেম/ব্যবহারকারীর মাধ্যমে বসিয়েছিল—তার পূর্ণ প্রযুক্তিগত প্রমাণ কোথায়?
কারণ উত্তরপত্র ও নম্বর ফর্দে অতিরিক্ত নম্বর পাওয়া এক ধরনের প্রমাণ। আর সেই পরিবর্তনের জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে দায়ী করা সম্পূর্ণ ভিন্ন স্তরের প্রমাণ। ফৌজদারি তদন্তে এই দুই স্তরের মধ্যে সেতু তৈরি করাই তদন্ত কর্মকর্তার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
আর ১২ খাতার রহস্য?
আরেকটি প্রশ্ন আরও জোরালো—ফল প্রকাশের পর কারা নক্ষত্রের ১২টি পত্রের পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করেছিল? পাঁচলাইশ থানার তদন্তে উত্তর পাওয়া যায়নি। সাইবার তদন্তেও উত্তর পাওয়া যায়নি। টেলিটক নম্বর পাওয়া গেছে। দোকান পাওয়া গেছে। রেফারেন্স নম্বর পাওয়া গেছে। এসএমএস পাওয়া গেছে। কিন্তু আবেদনকারী পাওয়া যায়নি। আর এই রহস্যের সঙ্গে ফল জালিয়াতির ঘটনা সরাসরি যুক্ত কি না—সেটিও নথিতে নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।
নথির সবচেয়ে বড় পাঁচ প্রশ্ন
এক. ১২টি পত্রের পুনঃনিরীক্ষণের আবেদনকারী কে? দুই. আবেদনে আবদুল আলীমের নম্বর কেন রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল? তিন. প্রকৃত নম্বর থেকে অতিরিক্ত নম্বরে যাওয়ার পুরো ডিজিটাল রেকর্ড কোথায়? চার. নারায়ণ চন্দ্র নাথের নির্দেশের সঙ্গে কিবরিয়া মাসুদের সুনির্দিষ্ট ডিজিটাল কার্যক্রমের প্রমাণ কী? পাঁচ. ‘ব্যবস্থা নিন’ নির্দেশনাকে কীভাবে ফল জালিয়াতির অপরাধের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে?
প্রশাসনিক তদন্তের সিদ্ধান্তকেই ফৌজদারি দায়ের প্রধান ভিত্তি বানানো কতটা যৌক্তিক
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের এই ঘটনা নিছক একজন পরীক্ষার্থীর ফলাফল নিয়ে বিতর্ক নয়। এখানে প্রশ্ন উঠেছে পরীক্ষার উত্তরপত্র, নম্বর ফর্দ, ফলাফল প্রস্তুত প্রক্রিয়া এবং একটি শিক্ষা বোর্ডের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে।
কিন্তু ফৌজদারি বিচারের জন্য আরেকটি প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন—এই জালিয়াতির প্রতিটি ধাপে কে কী করেছেন? সর্বশেষ চার্জশিটে চারজনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনা হলেও নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, তদন্তের কিছু জায়গায় সাক্ষ্য, পারিপার্শ্বিকতা ও প্রশাসনিক তদন্তের ওপর নির্ভরতা বেশি; সরাসরি ডিজিটাল ফরেনসিক প্রমাণের বিবরণ তুলনামূলকভাবে কম।
আর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো—যে ১২টি পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন এই ঘটনার প্রথম রহস্যের দরজা খুলেছিল, সেই আবেদনের প্রকৃতকারী আজও নথিতে অজ্ঞাত। ফলে এখন প্রশ্ন শুধু—‘ফল জালিয়াতি হয়েছিল কি না?’
তার পাশাপাশি বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত—‘ফল জালিয়াতির তদন্তে পুলিশের চার্জশিট কি আদালতে দাঁড়ানোর মতো প্রত্যক্ষ ও প্রযুক্তিগত প্রমাণের পূর্ণ চেইন তৈরি করতে পেরেছে, নাকি প্রশাসনিক তদন্তের সিদ্ধান্তকেই ফৌজদারি দায়ের প্রধান ভিত্তি বানানো হয়েছে?’ এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে—এটি একটি পরিপূর্ণ ফৌজদারি তদন্তের চার্জশিট, নাকি কিছু গুরুত্বপূর্ণ অমীমাংসিত প্রশ্ন রেখে দেওয়া একটি অসম্পূর্ণ তদন্তের ফসল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মামলা তদন্ত কর্মকর্তা এসআই এসএম সফিউল আজম মুন্সী বলেন, ‘অভিযোগপত্রে চারজনকে আসামি এবং ১৪ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইনসহ দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। আদালত অভিযোগপত্র পর্যালোচনা করে পরবর্তী আদেশ দেবেন।’
তবে ফলাফল পরিবর্তনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট কম্পিউটার, ইউজার, আইপি বা সার্ভার লগের ডিজিটাল অ্যাকসেসের বিষয়ে কোনো ফরেনসিক পরীক্ষা করা হয়েছে কি না কিংবা এসব আলামত জব্দ করা হয়েছে কি না—জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
পাঁচলাইশ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) অমিতাভ দত্ত বলেন, ‘চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ফল জালিয়াতির মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেওয়া হয়েছে, এটা সত্য। তবে একই মামলার বিষয়ে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট ও জিডির তদন্তে কী উল্লেখ করা হয়েছে, সে বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আদালত যদি মনে করেন, থানা পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন সন্তোষজনক হয়নি, তাহলে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দিতে পারেন।’
পাঁচলাইশ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহেদুল ইসলাম বলেন, ‘মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র আদালতে পাঠিয়েছেন। অভিযোগপত্রে চারজনকেই অভিযুক্ত করা হয়েছে। বাকি বিষয় আদালতের এখতিয়ার।’
সিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (প্রসিকিউশন) (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ হাসান ইকবাল চৌধুরী বলেন, ‘তদন্ত শেষে মামলার অভিযোগপত্র আদালতে পাঠানো হয়েছে। আদালতে ধার্য তারিখের পর পরবর্তী বিষয় সম্পর্কে জানাতে পারব। এর আগে এ বিষয়ে কিছু বলা সম্ভব নয়।’
(জেজে/এসপি/আগস্ট ২৫, ২০২৬)
