প্রচ্ছদ » দেশের বাইরে » বিস্তারিত
নেপালে বন্যায় নিখোঁজ ১৫০০, মৃত্যু ১৬৫ এর বেশি
২০২৬ আগস্ট ২৭ ১৪:৩১:৩৭
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : হিমালয় অঞ্চলে পাহাড়ধসের পর সৃষ্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় নেপাল ও চীনের তিব্বতজুড়ে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৫০০-তে পৌঁছেছে। তাদের মধ্যে ৭০০ জনের বেশিই বিদেশি নাগরিক। বুধবারের (২৬ আগস্ট) এই বিপর্যয়ের পর বৃহস্পতিবারও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, মৃতের সংখ্যা ১৬৫ ছাড়িয়েছে ও এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হিমালয়ের একটি নদীতে পাহাড়ের বিশাল অংশ থেকে কাদা ও পাথরের দেয়ালধস নেমে আসার পর এই বিপর্যয় শুরু হয়। প্রবল পানির স্রোত ও ধ্বংসাবশেষ নেপাল-তিব্বত সীমান্তের জনপদ, সড়ক ও অবকাঠামো ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
বুধবারের দুর্যোগে কাঠমান্ডু থেকে তিব্বতের লাসাকে সংযুক্ত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের আশপাশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওই পথে বহু ট্রেকার ও তীর্থযাত্রী চলাচল করতেন। বন্যার পর বহু শহর ও উপত্যকা বাইরের বিশ্বের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
নেপালের উদ্ধারকারীরা হেলিকপ্টার ব্যবহার করে নিখোঁজদের খোঁজে অভিযান চালাচ্ছেন। একই সঙ্গে দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন এলাকায় আটকে পড়া হাজারো মানুষের কাছে জরুরি ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
নেপাল পুলিশের মুখপাত্র আবি নারায়ণ কাফলে রয়টার্সকে বলেন, উদ্ধার অভিযান আবার শুরু হয়েছে এবং আরও মরদেহ উদ্ধারের আশঙ্কা রয়েছে। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
নেপালে পুলিশ ও পর্যটন কর্মকর্তাদের হিসাবে ৮২৬ জন এখনো নিখোঁজ। তাদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জন বিদেশি নাগরিক।
নিখোঁজ পর্যটকেরা বিশ্বের দুই ডজনের বেশি দেশের নাগরিক। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৭৭ জন ভারতীয়। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ৬৩ জন, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪ জন, যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন এবং কানাডার ২৫ জন নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন।
মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির ৫৫ নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তবে তাদের হতাহত হওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি।
চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সিসিটিভি জানিয়েছে, তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেখানে মৃতের সংখ্যা এখনো তিনজনেই রয়েছে।
তবে নেপাল ও তিব্বতের নিখোঁজ মানুষের এই দুটি হিসাবের মধ্যে কোনো ব্যক্তির নাম দুই জায়গাতেই রয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে স্পষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি।
যাচাই করা বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, গিরং সীমান্ত এলাকায় কাদা, পাথর ও পানির বিশাল স্রোত মানুষের ওপর আছড়ে পড়ছে। প্রবল স্রোতে বহু মানুষ ভেসে যান। নিচের দিকে নেপালের বিভিন্ন এলাকায় সেই ধ্বংসাত্মক স্রোত বাড়িঘর, সড়ক ও বিদ্যুৎ প্রকল্প ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
দুর্গম এলাকায় শুরু ত্রাণ সরবরাহ
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে এখন হেলিকপ্টার থেকে তাঁবু, খাবার ও অন্যান্য জরুরি ত্রাণসামগ্রী ফেলা হচ্ছে। এসব ত্রাণসামগ্রীর একটি অংশ দিয়েছে প্রতিবেশী ভারত।
নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেত বলেন, সেনাবাহিনী ও পুলিশের পাঁচ হাজারের বেশি উদ্ধারকর্মী অভিযানে অংশ নিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) উদ্ধারকারীরা ২০ জন বিদেশিসহ ১২৫ জনকে উদ্ধার করেছেন বলে জানান তিনি।
এদিকে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ ভয়াবহ ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর একটি নুয়াকোটের পরিস্থিতি সরেজমিন দেখতে সড়কপথে সেখানে গেছেন। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ তথ্য জানিয়েছে।
ভূমিকম্প নয়, হিমবাহের ধসের শক্তিই তৈরি করেছিল কম্পন?
নেপালি কর্মকর্তাদের প্রাথমিক প্রতিবেদনে ধারণা করা হয়েছিল, ওই এলাকায় সংঘটিত একটি ভূমিকম্পের কারণে হিমবাহের নিচের অংশ ধসে পড়ে এবং সেখান থেকেই আকস্মিক বন্যার সূত্রপাত হয়।
তবে পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে জানায়, প্রাথমিকভাবে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে চিহ্নিত কম্পনটি আসলে হিমবাহের পাথর ও বরফ ধসে পড়ার ফলে সৃষ্ট ভূকম্পন শক্তি ছিল। এরপরই শুরু হয় ধ্বংসাবশেষ বহনকারী প্রবল স্রোত।
চীনা কর্তৃপক্ষও নতুন একটি ঝুঁকির কথা জানিয়েছে। গিরং এলাকায় ভূমিধস ও বন্যাকবলিত নেপাল-তিব্বত সীমান্তের উজানে এখনো একটি বাঁধসদৃশ অবরুদ্ধ হ্রদ রয়েছে। সেটি উদ্ধারকাজকে আরও জটিল করে তুলতে পারে, বিশেষ করে সামনে বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায়।
গত বছরের জুলাইয়ে তিব্বতের পুরেপা হিমবাহের ওপরের একটি হ্রদ দ্রুত নিষ্কাশিত হওয়ার পর নেপালে প্রাণঘাতী বন্যা দেখা দিয়েছিল।
তীর্থযাত্রায় গিয়েই নিখোঁজ অনেকে
এ সপ্তাহের দুর্যোগে নিখোঁজ ও নিহতদের বড় একটি অংশ তিব্বতের কৈলাস-মানসসরোবর এলাকায় তীর্থযাত্রায় যাচ্ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উচ্চ পার্বত্য এই অঞ্চলটি হিন্দু, বৌদ্ধসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষের কাছে পবিত্র স্থান হিসেবে পরিচিত। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, কৈলাস পর্বত দেবতা শিবের আবাসস্থল। পর্বতটি মানসসরোবর হ্রদের তীরে অবস্থিত।
হিমালয়ভিত্তিক একটি পর্যটন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী সাগর পান্ডে জানান, তার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তীর্থযাত্রায় যাওয়া ভারতীয় বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ার ১৫ নাগরিক এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
হেলিকপ্টারে করে দুর্গত এলাকা ঘুরে দেখার পর তিনি ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, সেখানে মানবসৃষ্ট কোনো স্থাপনা বা বসতি আর অবশিষ্ট নেই। সবকিছু সমতল হয়ে গেছে। তার আশঙ্কা, হোটেল, রেস্তোরাঁ কিংবা গাড়ির ভেতরে থাকা মানুষদের কেউই হয়তো বেঁচে নেই।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ বলেন, দুর্যোগের বিস্তারিত তথ্য এখনো খুব সীমিত। নেপাল একটি উন্নয়নশীল দেশ ও অস্ট্রেলিয়ার মতো এমন দুর্যোগ মোকাবিলার পর্যাপ্ত সম্পদ তাদের নেই। ফলে দুর্গত এলাকা থেকে তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, তারা একজন দুর্যোগ মোকাবিলা বিষয়ক উপদেষ্টা পাঠাচ্ছে ও নেপালকে ৫ লাখ ডলারের সহায়তা দিচ্ছে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, তার দেশ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি এই বন্যাকে ‘ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস জানিয়েছেন, জাতিসংঘের বিভিন্ন দল ও অংশীদার সংস্থা দুর্গত নেপালি জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দিতে ত্রাণসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় জনবল পাঠাচ্ছে।
তথ্যসূত্র : রয়টার্স
(ওএস/এএস/আগস্ট ২৭, ২০২৬)
