প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত
বাংলা সাহিত্যের অনন্য প্রতিভা কবি নজরুলের মহাপ্রয়াণ
২০২৬ আগস্ট ২৭ ১৭:০১:১২ওয়াজেদুর রহমান কনক
বাঙালি জাতির সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে কবি কাজী নজরুল ইসলাম এক অবিনাশী আলোকবর্তিকা। ১২ ভাদ্র বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির আকাশে এক চিরকালীন শোকের দিন হলেও, কবির প্রয়াণ কেবল তাঁর দৈহিক অবসান ঘটিয়েছে মাত্র; তাঁর চিন্তা, চেতনা এবং দর্শন উত্তরোত্তর আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে সমকালীন বিশ্বে। উপনিবেশবাদ, সামাজিক বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা এবং শোষণের বিরুদ্ধে তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল বজ্রকঠিন,অথচ তাঁর অন্তরের কোমলতা ও অনুভূতির গভীরতা ছিল অসীম। তাঁর সাহিত্য ও সঙ্গীতের বিশাল পরিসরে সাম্য, দ্রোহ ও প্রেমের যে ত্রিবেণী সঙ্গম ঘটেছিল, তা কেবল বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেনি, বরং বিশ্বমানবধর্মের এক অনন্য দলিল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একটি সমাজকে প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ ও মানবিক করে তোলার জন্য যে আত্মিক ও মনস্তাত্ত্বিক শক্তির প্রয়োজন হয়, তার পরিপূর্ণ প্রকাশ ঘটেছে নজরুল-সাহিত্যে। তাঁর জীবনদর্শন ছিল মূলত মানবমুক্তির এক চিরন্তন দলিল, যেখানে পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্তির পাশাপাশি মানুষের অন্তর্নিহিত সত্তার জাগরণকে প্রধান্য দেওয়া হয়েছে।
নজরুল-চেতনার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো সাম্যবাদ, যা মার্কসবাদী দর্শনের প্রভাবে নয়, বরং তাঁর সহজাত মানবতাবোধ এবং ধর্মের প্রকৃত মানবিক শিক্ষার আলোকে বিকশিত হয়েছিল। তিনি এমন এক সমাজব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন যেখানে মানুষের সাথে মানুষের কোনো ভেদাভেদ থাকবে না, থাকবে না উচ্চ-নীচ বা ধনী-দরিদ্রের কৃত্রিম প্রাচীর কিংবা জন্মসূত্রে শ্রেষ্ঠত্বের কোনো অহংকার। তাঁর ‘সাম্যবাদী’ ও ‘সর্বহারা’ কাব্যে মানুষের মর্যাদা সবার উপরে স্থান পেয়েছে, যেখানে তিনি ঘোষণা করেছেন যে মানুষের চেয়ে মহান কিছু নাই, নাই মহীয়ান। এই দৃষ্টিভঙ্গি কেবল অর্থনৈতিক বা সামাজিক সমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি ছিল আত্মিক ও মনস্তাত্ত্বিক সমতার ঘোষণা। সমাজে বিদ্যমান জাতিগত বৈষম্য, বর্ণপ্রথা, গোত্রভিত্তিক বিভাজন এবং অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে তিনি লেখনীকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। ধর্মীয় গোঁড়ামি, কূপমণ্ডূকতা এবং অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল অত্যন্ত আপসহীন। তিনি দেখিয়েছেন যে স্রষ্টার দৃষ্টিতে সকল মানুষ সমান এবং কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা শ্রেণির মানুষের জন্মগত আধিপত্য বলে কিছু থাকতে পারে না। ঔপনিবেশিক শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট শোষিত মানুষের পক্ষে তাঁর এই অবস্থান তৎকালীন সমাজব্যবসভায় এক যুগান্তকারী বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব সাধন করেছিল, যা আজও সমতার অন্বেষায় থাকা মানবসমাজকে নতুন দিশা দেখায়।
সাম্যের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই দ্রোহের জন্ম হয়, কারণ বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষের স্বাভাবিক প্ৰতিবাদ ও প্রতিরোধই হলো দ্রোহ। নজরুল বাংলা সাহিত্যে ‘বিদ্রোহী’ কবি হিসেবে অভিষিক্ত হলেও তাঁর দ্রোহ নিছক ক্ষোভ বা নৈরাজ্য নয়; এটি ছিল শোষিত মানবতার মুক্তির একমাত্র ঐতিহাসিক পথ। বিশ শতকের প্রথমভাগে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের শোষণ, নিপীড়ন এবং দেশীয় সামন্তবাদের নিষ্ঠুর যাঁতাকলে যখন সাধারণ মানুষ নিষ্পেষিত হচ্ছিল, তখন নজরুল হয়ে ওঠেন সেই বঞ্চিত মানুষের মুখপত্র ও আশার আলোকবর্তিকা। তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা কিংবা ‘ভাঙার গান’-এর পংক্তিগুলো পরাধীনতার জিঞ্জির ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার এক অদম্য স্পৃহা জাগিয়েছিল সমগ্র জাতির মনে। তাঁর দ্রোহ কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্য ছিল না, এটি ছিল সামাজিক কুসংস্কার, মানসিক দাসত্ব এবং ধর্মীয় অন্ধত্বের বিরুদ্ধে এক নিরন্তর ও আপসহীন সংগ্রাম। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে পরাধীনতার গ্লানি কেবল শারীরিক বা রাজনৈতিক নয়, এটি মানুষের মনন, মেধা এবং আত্মাকেও পঙ্গু করে দেয়। তাই তিনি পরাধীন জাতির মন থেকে ভয়ের সংস্কৃতি দূর করতে বিদ্রোহের লেলিহান শিখা জ্বেলে দিয়েছিলেন। তাঁর লেখনীতে তলোয়ারের চেয়েও কলমের শক্তি অনেক বেশি প্রবল হয়ে উঠেছিল, যা শাসকশ্রেণির ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল এবং সাধারণ মানুষকে তাদের নায্য অধিকার আদায়ে সোচ্চার হওয়ার অবিচল সাহস জুগিয়েছিল।
দ্রোহ এবং সাম্যের পাশাপাশি নজরুলের সাহিত্য ও সত্তার অপর এক অবিচ্ছেদ্য ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো প্রেম, যা তাঁর সৃষ্টির অন্যপিঠের সুকুমার রূপ। অনেকের মতেই, যার অন্তরে গভীর ভালোবাসার উৎস নেই, সে কখনো প্রকৃত অর্থে দ্রোহী বা সাম্যবাদী হতে পারে না। নজরুলের প্রেম কেবল নর-নারীর রোমান্টিক অনুভূতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি প্রসারিত হয়েছিল সর্বজনীন মানবপ্রেম, প্রকৃতিপ্রেম এবং পরম সত্তার প্রতি সুফি ভাবাবেগের অনন্য ও সুগভীর স্তরে। তাঁর গানে ও কবিতায় প্রেমের বহুমুখী রূপ প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে বিরহ, মিলন, আনন্দ ও বেদনার নিখুঁত শিল্পরূপ পরিলক্ষিত হয়। তিনি প্রেমকে সব ধরনের সংকীর্ণতা, সামাজিক সীমানা এবং গোঁড়ামির গণ্ডি থেকে মুক্ত করেছিলেন। তাঁর প্রেম যেমন প্রিয়ার চোখের চাওয়াতে আচ্ছন্ন, তেমনই তা বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত মানবতার ব্যথায় সমব্যাথী। নজরুল ইসলাম ইসলামি গান ও গজল রচনার পাশাপাশি অজস্র শ্যামাসংগীত, কীর্তন ও ভক্তিগীতি রচনা করে প্রমাণ করেছিলেন যে তাঁর হৃদয়ে যে প্রেমের আলো জ্বলছে, তা কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়। এই সর্বজনীন প্রেমচেতনা মানুষের মন থেকে হিংসা, দ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতা এবং হানাহানি দূর করে এক শান্তিময় ও সৌহার্দ্যপূর্ণ বিশ্ব গড়ে তোলার গভীর অনুপ্রেরণা জোগায়।
পরিশেষে এবং সামগ্রিক মূল্যায়নে বলা যায়, কাজী নজরুল ইসলামের সাম্য, দ্রোহ ও প্রেম কোনো বিচ্ছিন্ন বা খণ্ডিত সত্তা নয়, বরং এগুলো একই মহাবৃক্ষের ভিন্ন ভিন্ন শাখা, যা পরিপুষ্ট হয়েছে একটি একক, সংহত ও প্রগতিশীল মানবতাবাদী দর্শনের মাধ্যমে। তিনি সাম্যের মাধ্যমে মানুষকে তার জন্মগত অধিকার সম্পর্কে সচেতন করেছেন, দ্রোহের মাধ্যমে সেই অধিকার ছিনিয়ে আনার শক্তি জুগিয়েছেন এবং প্রেমের মাধ্যমে সমাজকে সুসংহত ও মানবিক করে তোলার পথ দেখিয়েছেন। তাঁর প্রয়াণ দিবসে দাঁড়িয়ে আজ গভীরভাবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন যে, বর্তমান বিশ্ব যখন নানা রকম যুদ্ধবিগ্রহ, অসহিষ্ণুতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সংকীর্ণ জাতীয়বাদে দীর্ণ, তখন নজরুল-চেতনার প্রাসঙ্গিকতা বহুগুণ বেড়ে গেছে। মানবমুক্তির চিরন্তন দিশারি হিসেবে নজরুল আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে যেমন অম্লান, তেমনি বিশ্বসাহিত্যের দরবারেও এক অনন্য মহিমায় ভাস্বর। তাঁর এই ত্রিমুখী আদর্শকে ব্যক্তি ও সমাজজীবনে যথাযথভাবে ধারণ করতে পারলেই একটি শোষণহীন, সাম্যভিত্তিক এবং প্রেমময় পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব হবে, যেখানে প্রতিটি মানুষ স্বাধীনভাবে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার অধিকার পাবে।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী।
