প্রচ্ছদ » পাঠকের লেখা » বিস্তারিত
শিল্পবোধ
২০২৬ আগস্ট ২৭ ১৭:১৭:১৮
মহিদুল ইসলাম মাহী
একটি বাদ্যযন্ত্র কেবল কাঠ, চামড়া আর ধাতুর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা কোনো নির্জীব বস্তু নয়। এর প্রতিটি অলংকরণে জমে থাকে একজন মানুষের অপূর্ণ শৈশব, কিছু না-পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস এবং একসময় নিজের উপার্জনে অর্জিত এক টুকরো আত্মতৃপ্তি। ছোটবেলায় সুরের তীব্র আকুলতা থাকা সত্ত্বেও যখন সামর্থ্যের অভাবে কোনো যন্ত্র হাতে ওঠে না, তখন সেই অপূর্ণতা মনের গভীরে এক গভীর তৃষ্ণা তৈরি করে। বহু বছর পর রক্ত জল করা উপার্জনে যখন সেই স্বপ্নের স্পর্শ মেলে, তখন তার আবেগীয় মূল্য অন্য কারো পক্ষে পরিমাপ করা অসম্ভব।
অথচ আমাদের সমাজে প্রায়শই একটি ভুল ধারণা দেখা যায়—যিনি গান গান, কেবল তিনিই বুঝি শিল্পী। কিন্তু শিল্পীর পরিচয় তো কেবল কণ্ঠে বা পরিবেশনায় সীমাবদ্ধ নয়। শিল্পী বলতে আসলে তাঁকেই বোঝায়, যার ভেতরে রয়েছে খাঁটি ‘শিল্পবোধ’। শিল্পী তিনিই, যিনি সুরের ভেতরের ব্যথা ও আনন্দকে স্পর্শ করতে পারেন, যিনি সুস্থ ও সুন্দর জীবনকে উপলব্ধি করেন।
যখন সুরের ভাবনাহীন কোনো মানুষ ক্ষোভ বা রূপকের বশে সেই অর্জিত বাদ্যযন্ত্র বা স্টুডিওর সরঞ্জামকে ‘পুড়িয়ে দেওয়ার’ কথা বলে, তখন আঘাতটা কেবল আসবাবের ওপর আসে না—আঘাতটা লাগে মানুষের শৈশব, সাধনা ও অস্তিত্বের শেকড়ে। আবার কখনো কখনো কাছের মানুষেরা দ্বিধায় পড়ে প্রশ্ন তুলে বসে, "আমরা বড়, নাকি তোমার এই গান-বাজনা ও শিল্প বড়?"
এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একজন শিল্পী কেবল হেসে নীরব থাকেন না, বরং সত্যকে উন্মোচিত করেন। প্রিয়জন আর শিল্পের মধ্যে কোনো তুলনা বা প্রতিযোগিতা চলেই না। স্ত্রী, প্রেমিকা, মা কিংবা বোন—তাঁরা থাকেন হৃদয়ের সবচেয়ে উঁচুতে, ভালোবাসার আসনে। কিন্তু শিল্প? সে তো আর হৃদয়ের অলংকার নয়, সে তো বাস করে সরাসরি আত্মার গভীরে!
শিল্প না থাকলে সেই মানুষটির আত্মাই তো মরে যায়, তার অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যায়। আর যার নিজের সত্তাই আর টিকে থাকে না, সে অন্যকে ভালোবাসবে কী দিয়ে? কীভাবে টিকিয়ে রাখবে রক্ত-মাংসের সম্পর্কগুলোকে?
কাঠের তৈরি কোনো যন্ত্র হয়তো আগুনে ছাই হয়ে যেতে পারে, কিন্তু যে শিল্প মানুষের আত্মার সাথে মিশে থাকে, তাকে ছাই করার শক্তি এ জগতে কারও নেই। প্রিয়জনেরা যদি হন জীবনের পরম আশ্রয়, তবে শিল্প হলো সেই জীবনের মূল প্রাণশক্তি।
লেখক: গীতিকার, সুরকার, কণ্ঠশিল্পী ও কবি।
