ঢাকা, রবিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৬, ১৫ ভাদ্র ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » দেশের খবর » বিস্তারিত

বনদস্যু আতঙ্ক ও ঋণের বোঝা নিয়েই সুন্দরবনে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে বনজীবীরা

২০২৬ আগস্ট ৩০ ১৮:৩১:০৩
বনদস্যু আতঙ্ক ও ঋণের বোঝা নিয়েই সুন্দরবনে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে বনজীবীরা

রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : দীর্ঘ তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে আগামী পহেলা সেপ্টেম্বর থেকে খুলে যাচ্ছে সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার। সুন্দরবন নির্ভর বনজীবীর চোখে স্বপ্ন থাকলেও রয়েছে বনদস্যু আতঙ্ক। তবুও সুন্দরবনে যাওয়ার জন্য আগাম প্রস্তুতি শুরু করেছেন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপকূলবর্তী বনজীবী, জেলে-বাওয়ালী, ট্রলার মালিকরা। সুন্দরবনে যাওয়ার প্রস্তুতি হিসাবে কেউ মেরামত করছেন নৌকা, কেউ জাল, কেউবা পর্যটকবাহী ট্রলার।

জুন, জুলাই ও আগস্ট সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও মাছের প্রজনন মৌসুম হওয়ায় ৩ মাসের জন্য সুন্দরবনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করে বনবিভাগ। এই সময়ে জেলেদের মাছ-কাঁকড়া আহরণ, বাওয়ালীদের গোলপাতা ও মধু সংগ্রহ, এমনকি পর্যটকদের বনে প্রবেশও সম্পূর্ণভাবে বন্ধ থাকে। তবে নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ায় পহেলা সেপ্টেম্বর থেকে পূর্ব ও পশ্চিম সুন্দরবনের সব প্রবেশপথ আবারও খুলে দেওয়া হবে।

দীর্ঘ তিন মাস সুন্দরবনে প্রবেশ করতে না পেরে ঋণ করে সংসার চালাতে হয়েছে বলে জানান বনজীবীরা। ঋণ শোধ করার স্বপ্ন তাদের চোখে। তবে সেই স্বপ্নের মাঝে দুঃস্বপ্ন বনদস্যু আতঙ্ক। বনে গিয়ে কষ্ট করে মাছ-কাঁকড়া ধরে ঋণ পরিশোধ করার আশা থাকলেও শেষ পর্যন্ত আশা পূরণ হবে কিনা, এই অনিশ্চয়তা নিয়েই সুন্দরবন খোলার অপেক্ষায় তারা।

জেলে আয়ুব আলী, ইসমাইল হোসেন, সুবোল মুন্ডাসহ কয়েক বলেন, তিন মাস সুন্দরবন বন্ধ থাকায় চরম কষ্টে দিন কেটেছে। সুদে টাকা নিয়ে সংসার চালাতে হয়েছে। আবার এখন সুদ করেই নৌকা, জাল সারাই করছি। মঙ্গলবার বন খুলবে, বনে গিয়ে মাছ-কাঁকড়া ধরে ঋণ শোধের পাশাপাশি ছেলে-মেয়েদের পড়া-লেখা, বাবা-মায়ের ঔষধ ও সংসারের খরচ যোগাতে হবে।

তারা শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে সুন্দরবনে আলিম ওরফে আলিফ বাহিনী, কাজল ওরফে মুন্না বাহিনী,খোকাবাবু বাহিনী ও নানা ভাই ওরফে ডন বাহিনীসহ পাঁচটি বনদস্যু দল দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আয় করে তা দিয়ে ঋণশোধ করবো, সংসার চালাবো, নাকি বনদস্যুদের চাঁদা দেব- আল্লাহ জানে।

শুধু জেলে নন, সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে যাদের অন্য ধরনের জীবিকা রয়েছে, তারাও তিন মাসের ধাক্কা সামলানোর চেষ্টা করছেন।

নীলডুমুর ট্রলার মালিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হালিম জানান, পর্যটকের ওপর নির্ভর করে সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকায় পাঁচ শতাধিক ট্রলার চলে। সুন্দরবনে জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত মাছ ও কাঁকড়া ধরা বন্ধ রাখার পাশাপাশি পর্যটক ঢোকা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ সময় ট্রলারচালক ও শ্রমিকরা বেকার জীবন যাপন করেন। তাঁদের সংসার চলে খুব কষ্টে ধার দেনা করে।

স্থানীয় একাধিক জেলে জানান, তিন মাস আগে যখন বনে ঢোকা যেতো, তখনও বনদস্যুদের মাথা পিছু ৫০ থেকে৭০ হাজার টাকা চাঁদা দিয়ে তাদের থেকে পাঁচ টাকার নোটের অর্ধেক স্লিপ হিসেবে নিয়েই বনে প্রবেশ করতে হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বনদস্যু নির্মূলে একাধিকবার আশ্বাস দেওয়া হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ বা অভিযান দেখা যায়নি। তাই জেলে-বাওয়ালীদের মনে শঙ্কা কাটছে না।

অন্যদিকে, একাধিক জেলে জানান, সুন্দরবনের প্রায় ৭০ ভাগ এলাকা অভয়ারণ্য হিসেবে সবসময়ই বন্ধ থাকে। জেলেদের দাবি, ৩ মাসের নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে অসাধু জেলেরা অভয়ারণ্য এলাকায় প্রবেশ করে বিষ দিয়ে মাছ ধরা এবং ফাঁদ পেতে হরিণ শিকার করে। কারণ অভয়ারণ্য এলাকায় মাছ ও হরিণ শিকার করতে অসাধুচক্রের সুবিধা হয়ে থাকে।

স্থানীয় জেলেদের দাবি, সুন্দরবনের ৬০ ভাগ মাছ-কাঁকড়া আহরণের জন্য উন্মুক্ত করা হোক। এতে সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ শিকার ও ফাঁদ পেতে হরিণ শিকার কমবে।

বনবিভাগ সূত্রে জানাযায়, সুন্দরবনে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা শেষে পহেলা সেপ্টেম্বর হতে পাস দেওয়া হবে। পাস নিয়ে জেলে-বাওয়ালী ও পর্যটকবাহী ট্রলার পর্যটক নিয়ে সুন্দরবনের প্রবেশ করতে পারবেন। একই সঙ্গে সুন্দরবনের পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় সবাইকে নির্দেশিত নিয়ম-কানুন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. মশিউর রহমান বলেন, সুন্দরবন শুধু জীববৈচিত্র্যের আধার নয়, এটি মৎস্যসম্পদেরও গুরুত্বপূর্ণ উৎস। পহেলা সেপ্টেম্বর থেকে জেলে ও পর্যটকদের সুন্দরবনে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট ফরেস্ট স্টেশনগুলোকে দেওয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা।

(আরকে/এসপি/আগস্ট ৩০, ২০২৬)