ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯ ভাদ্র ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » দেশের খবর » বিস্তারিত

রামায়ন ও কবি গানে মানুষের হৃদয়ে জয় করেছে মৃনাল সরকার

২০২৬ সেপ্টেম্বর ০৩ ১৭:৩৯:৩১
রামায়ন ও কবি গানে মানুষের হৃদয়ে জয় করেছে মৃনাল সরকার

বিপুল কুমার দাস, রাজৈর : গ্রাম বা শহরের যেখানেই বসছে রামায়ন বা কবি গানের আসর,আর সেখানেই সকল ধর্মের মানুষের মিলন মেলায় পরিনত হচ্ছে। অসাম্প্রদায়িক চেতনা আর অহিংস নীতিতে বাংলার লোক সংস্কৃতি রামায়ন ও কবি গানে আধ্যাত্মিকতার ছোয়া লাগছে মানুষের হৃদয়ে। রামায়ন ও কবি গানের আসর বসছে দিনে ও রাতে।সনাতনীদের অনেকেই তাদের প্রয়াত পিতা-মাতার আত্মার শান্তি কামনায় রামায়ন গানের আয়োজন করে থাকেন। আবার হিন্দু ধর্মীয় পার্বন অনুসারে কবি গানের আয়োজন করে থাকেন। বাংলার লোক সংস্কৃতির যে ধারা গ্রাম-বাংলার উঠোন থেকে উঠোনে বেঁচে আছে, সেই ধারার এক নিবেদিত প্রাণ লোককবি মৃনাল সরকার। রামায়ণ গান আর কবি গানের আসরকে তিনি গত দুই দশক ধরে জীবন্ত রেখেছেন আপন কণ্ঠ ও সাধনায়।

লোককবি মৃনাল সরকারের প্রকৃত নাম মৃনাল বালা। পিতা শচীন বালা, মাতা কাঞ্চনী বালা। বাড়ি মাদারীপুর জেলার রাজৈর উপজেলার আমগ্রাম ইউনিয়নের দক্ষিণপাড়া গ্রামে। গ্রামের মাটি, মানুষ আর ধর্মীয় আবহেই তার বেড়ে ওঠা। তিনি শুধু শিল্পী নন, একজন শিক্ষিত সংস্কৃতি সাধক। তিনি লোক সংস্কৃতি চর্চার পাশাপাশি ২০১০ সালে অনার্স ও ২০১১ সালে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি তিনি বেছে নিয়েছেন লোকসংস্কৃতির কঠিন পথ।

প্রায় ২০ বছর যাবৎ অসাম্প্রদায়িক চেতনায় তিনি সুনামের সহিত রামায়ণ গান ও কবিগান পরিবেশন করে আসছেন। বিশেষ করে পরীক্ষিত বালার আদর্শে ধর্মীয় ও পালাগান তার কণ্ঠে এক অন্য মাত্রা পায়। যেখানে আধুনিকতার স্রোতে অনেকেই লোকগান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, সেখানে মৃনাল সরকার গ্রামে গ্রামে গিয়ে আসর মাতিয়ে চলেছেন। তার আসরে থাকে ভক্তি, তত্ত্ব এবং সমাজ-চেতনার অপূর্ব মিশেল। তার গান শুধু বিনোদন নয়, মানুষকে নৈতিকতা ও মানবতার বাণী শোনায়। এজন্য স্থানীয় ভক্তদের কাছে তিনি শুধু শিল্পী নন, 'চারণকবি' হিসেবেও পরিচিত।

সংগীত অঙ্গনে তার অবদান অনস্বীকার্য। নতুন প্রজন্মের অনেক শিল্পী তার কাছে তালিম নিচ্ছেন। তার এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা যদি একাডেমিক স্বীকৃতি পায়, তবে তা বাংলার লোক সংস্কৃতির ভান্ডারকে আরও সমৃদ্ধ করবে বলে মনে করেন সুধীজন। নতুন শিল্পী তৈরির জন্য তিনি নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন, যারা ভালো ধর্মীয় গান পরিবেশন করতে পারে।

দীর্ঘ সঙ্গীত সাধনার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি একাধিক সম্মাননা ডিগ্রি লাভ করেছেন। শ্রীশ্রী হরি-গুরুচাঁদ মতুয়া মিশন কর্তৃক বিশেষ সম্মাননা। বাগেরহাট জেলার কচুয়া থানার পশ্চিম বিসারখোলা গ্রামের যুব ক্লাব কর্তৃক সম্মাননা স্মারক। সমীকরণ আদর্শ সাংস্কৃতিক সংগঠন, ঢাকা কর্তৃক নেলসন ম্যান্ডেলা শান্তি পুরস্কার ২০২৪ অর্জন।

উচ্চ শিক্ষিত হয়েও মৃনাল সরকার প্রমাণ করেছেন, শেকড়কে ভোলা যায় না। তিনি চাকুরির পিছনে না ঘুরে গ্রাম বাংলার লোক সংস্কৃতিকে আকড়ে আছেন। শহরের চাকচিক্য ছেড়ে তিনি পড়ে আছেন বাংলার লোক গানকে আঁকড়ে। বাংলার এই কৃতি সন্তানের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করছে এলাকাবাসী। লোকসংস্কৃতির এই বাতিঘরকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

সরকারি রাজৈর কলেজের সাবেক অধ্যাপক নিতীশ দাস বলেন, এই কলেজের প্রাক্তন ছাত্র মৃনাল সরকার উঠোন থেকে উঠোনে রামায়ণ ও কবি গান পরিবশেন করে মানুষের মন জয় করে নিয়েছে।
এটা সরকারি রাজৈর কলেজের সকল শিক্ষকদের অহঙ্কার ও গৌরবের।

গবেষক, গীতিকবি ও শিশুসাহিত্যিক এবং বাংলা। একাডেমির জীবন সদস্য জ্যোতির্ময় সেন বলেন, লোককবি মৃণাল সরকার মাদারীপুরের ছেলে। ছেলেবেলা থেকেই লোকসংগীতের প্রতি ছিল তাঁর প্রবল আকর্ষণ। সেই আকর্ষণ ও স্বপ্নকে সামনে রেখেই একাগ্র সাধনায় তিনি করতে পেরেছেন তাঁর স্বপ্নপূরণ। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী এই চারণ কবি বর্তমানে ঘুরে ঘুরে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে কবি ও রামায়ণ গান পরিবেশন করছেন। ঠাঁই করে নিয়েছেন গণমানুষের হৃদয়ে। লোককবি মৃণাল সরকার শিক্ষিত চারণ কবি। এমএ পাস করেছেন তিনি। পড়াশোনার প্রতি তাঁর প্রবল ঝোঁক। ফলে কবির লড়াইয়ে নিজেকে শাণিত করার জন্য পাচ্ছেন নানা স্বাদের মালমসলা। তিনি মেধা, মনন, অধ্যবসায় ও সাধনায় জটিল ও দুরূহ বিষয়গুলো সহজ, সাবলীল কাব্যছন্দে পৌঁছে দিচ্ছেন শ্রোতাদের কাছে। আমার বিশ্বাস, তাঁর সাধনা অব্যাহত থাকলে তিনি একদিন গলায় পরতে পারবেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের স্বীকৃতির বিজয়মাল্য।

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত ফোকলোরবিদ ও কবি ড.তপন বাগচী বলেন, রামায়ণ গান ও কবিগান বাংলায় চিরায়ত সংস্কৃতিকে যারা বহন করে চলেছেন তাঁদের মধ্যে মৃনাল সরকার একজন। তিনি বাঙ্গালিকে লোকশিক্ষায় শিক্ষিত করে চলেছেন। শিক্ষা ও বিনোদনের পাশাপাশি ধর্মীয় চেতনা বৃদ্ধি ও শুভবুদ্ধির প্রসারে ভূমিকা রেখে চলেছেন। তাঁর এই মহান কর্মকে আমি স্বাগত জানাই।f

শিল্পী ও সাহিত্যিক অধ্যাপক ড.সন্তোষ ঢালী বলেন,স্বভাবকবি ও লোককবি মৃনাল বিশ্বাস সহজাত প্রতিভার অধিকারী।মুলতঃ তিনি রামায়ণ গান করে থাকেন। পাশাপাশি কবিগান ও কীর্তন গানও পরিবেশন করে থাকেন।তিনি বাংলার লোকগীতির একজন ধারক ও বাহক। এধরনের চারণকবিরাই বাংলার লোকসংস্কতিকে লালন করে রাখেন। আমি তাঁর সার্বিক মঙ্গল প্রত্যাশা করছি।

(বিডি/এসপি/সেপ্টেম্বর ০৩, ২০২৬)