প্রচ্ছদ » দেশের খবর » বিস্তারিত
লৌহজংয়ের বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ
থানায় মধ্যরাতে অবস্থান, ইউএনও কার্যালয়ে পাল্টা অভিযোগ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ০৩ ১৯:০৫:৩৯
মোঃ মাসুদ খান, মুন্সীগঞ্জ : মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের মেদিনীমন্ডল ইউনিয়নে বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার, ড্রেজার ব্যবস্যা ও জমি এবং যানবাহন থেকে উঠানো চাঁদার টাকার ভাগাভাগি নিয়ে ধাওয়া পাল্টা দাওয়া, মারামারি ও অস্ত্র প্রদর্শণের ঘটনা ঘটেছে। থানার সামনে এক পক্ষ বিচারের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে। অপর পক্ষ ড্রেজার অপসারণের দাবিতে ইউএনও বরাবর আবেদন করেছে। এ নিয়ে এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। যে কোন সময় বড় ধরণের রক্তক্ষয়ি সংঘর্ষের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ছালাম মোল্লা গ্রুপের দাবি, কোটি টাকার জালিয়াতি ও চাঁদাবাজির ঘটনা ধামাচাপা দিতেই অবৈধ ড্রেজারের গল্প সাজিয়ে পাল্টাপাল্টি নাটক তৈরি করা হচ্ছে। অপর দিকে পাভেল মোল্লা গ্রুপের দাবি চাদাবাজি ও অবৈধ ড্রেজার ব্যবসা করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ছালাম মোল্লা গ্রুপ।
স্থানীয় ও সূত্রে জানা যায়, বুধবার সন্ধ্যায় স্থানীয় বিএনপি নেতা লুৎফর রহমান পাভেল মোল্লার নেতৃত্বে মাওয়ায় অবৈধ ড্রেজার ব্যবসার বিরুদ্ধে একটি বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করা হয়। মিছিলটি শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে স্থানীয় বিএনপির নেতা সালাম মোল্লার সমর্থকদের সঙ্গে পাভেল মোল্লার সমর্থকদের কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে পাভেল মোল্লার পক্ষ থেকে দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় ও হাতাহাতি ও সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।
সংঘর্ষের পর রাত আনুমানিক ১টার দিকে সালাম মোল্লা গ্রæপের নেতাকর্মীরা পদ্মা সেতু উত্তর থানায় গিয়ে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। তাদের দাবি, পাভেল মোল্লার মিছিলে প্রকাশ্যে দেশীয় অস্ত্র প্রদর্শন করা হয়েছে। অবস্থান কর্মসূচি থেকে থানার ভারপ্রপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কাছে অবিলম্বে এসব দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারের জোর দাবি জানানো হয়।
এদিকে বৃহস্পতিবার ৩ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ মেদিনীমন্ডল এলাকার বাসিন্দা মাসুদা বেগম নামের এক নারী লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর একটি লিখিত আবেদন জমা দেন। আবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ মেদিনীমন্ডল এলাকায় অবৈধভাবে ড্রেজারের পাইপ বসানোর কারণে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে প্রায় ২৫টি পরিবার দীর্ঘদিন ধরে মারাত্মক জলাবদ্ধতায় আটকে থেকে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। ড্রেজারের অবৈধ কার্যক্রম নিয়ে কথা বলতে গেলে সংশ্লিষ্ট চক্রটি এলাকাবাসীকে মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দ্রæত ড্রেজারের পাইপ অপসারণ এবং এলাকাবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
ইউএনও কার্যালয়ে দেওয়া আবেদনকে ‘সাজানো নাটক’ বলে দাবি করেছে সালাম মোল্লা গ্রæপ। তাদের অভিযোগ, গত ৫ আগস্টের পর থেকে পাভেল মোল্লা ও তার অনুসারীরা এলাকায় নানা ধরনের চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।
সালাম মোল্লার সমর্থকদের দাবি, হলদিয়ার মৌছামান্দা এলাকা থেকে খান বাড়ি এলাকার একটি জমি’ ভূয়া ওয়ারিশ সাজিয়ে রেজিস্ট্রি করে বিক্রি করা হয়। সেখান থেকে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা পাভেল মোল্লার হাত দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় বাটোয়ারা করা হয়। বিষয়টি নিয়ে গত শুক্রবার স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও দলীয় নেতাদের উপস্থিতিতে এক সালিশ বৈঠক বসে। বৈঠকে উক্ত ১ কোটি ৬০ লাখ টাকার সুনির্দিষ্ট হিসাব চাওয়া হলে পাভেল মোল্লা কোনো জবাব দিতে না পেরে ক্ষুব্ধ হয়ে সালিশ ছেড়ে চলে যান। মূলত এই বিশাল অঙ্কের টাকার হিসাব এড়াতেই তিনি অবৈধ ড্রেজারের অজুহাত তুলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছেন।
অভিযোগ প্রসঙ্গে মেদিনী মন্ডলের স্থানীয় ভূমির মালিক তারা মাতবর জানান, “কারো জায়গায় ড্রেজারের পানি ফেলা হয়নি। এটি ড্রেজারের কোনো সমস্যা নয়। মেদিনী মন্ডল ইউনিয়নের কয়েকটি ওয়ার্ডে দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী জলাবদ্ধতা রয়েছে। মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের নিচে বেশ কয়েকটি কালভার্ট রয়েছে যার একটি ‘লিফ লাউঞ্জ রেস্টুরেন্ট’ দখল করে রেখেছে। এসব সরকারি খাল ও কালভার্ট দখলমুক্ত করলে জলাবদ্ধতা এমনিতেই দূর হবে। অথচ ১ কোটি ৬০ লাখ টাকার চাঁদাবাজির প্রশ্ন থেকে মুখ লুকাতে ড্রেজারকে হাতিয়ার বানানো হচ্ছে।
বর্তমানে মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে, মেদিনী মন্ডল ও পদ্মা সেতু উত্তর থানা সংলগ্ন এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিএনপির দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও থানায় অবস্থানের পর যেকোনো সময় বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ।
এ ব্যাপারে উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব পাভেল মোল্লা জানিয়েছেন, ড্রেজার ব্যবসা ও চাঁদাবাজির ঘটনা ধামাচাপা দিতেই সালাম মোল্লার লোকজন আমার বিরুদ্ধে অবৈধভাবে ব্যক্তির অভিযোগ এনেছে।। এটা কোনদিন সত্যি নয়। আমি এই ধরনের কোন কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত নই। বালুর ব্যবসা দিতেই আমার বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ করা হচ্ছে।
অপরদিকে জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য ও সাবেক সদস্য সচিব আব্দুস সালাম মোল্লা বলেন, ঘটনার সময় আমি আমার বাড়িতে ছিলাম। এ বিষয়ে আমি কিছুই জানিনা। তারপরেও কেন আমাকে দোষারোপ করা হচ্ছে। তবে শুনেছি সামান্য হাতাহাতি হয়েছে। কোন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু পাভেল মোল্লা নাকি অস্ত্র প্রদর্শন করেছেন। তাছাড়া আমি কোনরকম চাঁদাবাজি বা অবৈধ বালু ব্যবসার সাথে জড়িত নয়। আমার রাজনৈতিক সুনাম বিনষ্ট করতে প্রতিপক্ষরা আমার বিরুদ্ধে এরকম অভিযোগ করছে।
পদ্মা সেতু উত্তর থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি আখতার হোসেন জানিয়েছে, এ ব্যাপারে একটি অভিযোগ পেয়েছি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় টহল জোরদার করা হয়েছে। অস্ত্র প্রদর্শনের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে এবং লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারাজানা ববি মিতু জানিয়েছেন, জলাবদ্ধতা ও বালুর গদির ব্যাপারে আমি ইতিমধ্যে মেদিনী মন্ডল ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (নায়েব)-কে পাঠিয়ে বিষয়টি তদন্ত করতে বলেছি। তদন্ত রিপোর্ট পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
(এমকে/এসপি/সেপ্টেম্বর ০৩, ২০২৬)
