প্রচ্ছদ » কৃষি » বিস্তারিত
ধাত্রী থেকে যেভাবে জলবায়ু-সহিষ্ণু চাষি হলেন রেনুকা
২০২৬ সেপ্টেম্বর ০৬ ১৯:১২:১৭
স্টাফ রিপোর্টার : বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম পূর্ব আমড়াগাছিয়া। দরিদ্র এই জনপদে রেনুকা রাণী মিস্ত্রি দীর্ঘ সময় ধাত্রীসেবা দিয়ে আসলেও তার আয়-রোজগার তেমন ছিল না। ফলে বছরের একটি বড় সময় অর্থকষ্টে কাটাতে হতো।
তবে এখন সময় বদলেছে। পরিচয়ের পরিবর্তন ঘটিয়ে ৬৩ বছর বয়সী রেনুকা এখন এলাকার মানুষের কাছে পরিচিত আধুনিক এক প্রান্তিক চাষি হিসেবে। জলবায়ু-সহিষ্ণু ফসল চাষ করে এক মৌসুমেই তিনি আয় করছেন প্রায় ৫০ হাজার টাকা, সংসারেও ফিরিয়েছেন স্বচ্ছলতা।
ধাত্রী থেকে সফল চাষি হয়ে ওঠার এই যাত্রা রেনুকার জন্য সহজ ছিল না। আংশিক কৃষিনির্ভর চার সদস্যের পরিবার নিয়ে তিনি বছরের পর বছর আর্থিক দৈন্যদশায় আটকে ছিলেন। রেনুকার স্বামী প্রায় এক দশক কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল লবণাক্ততা, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং আধুনিক পদ্ধতির অভাব। ফলে হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে ফসল চাষ করেও লাভ আসত না।
অবশেষে ব্র্যাক ব্যাংকের অর্থায়নে এবং এনজিও ব্র্যাকের ব্যবস্থাপনায় 'অপরাজেয় দেশ' প্রকল্পের অধীনে পরিচালিত 'অ্যাডাপ্টেশন ক্লিনিক' পরিবারটির জন্য স্বস্তি নিয়ে এসেছে। ব্যতিক্রমী এই ক্লিনিক থেকে জলবায়ু-সহিষ্ণু সবজি চাষ, ঋতুভিত্তিক পরিকল্পনা, মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনা এবং জৈবিক উপায়ে বালাইনাশক ব্যবহারের কৌশল শিখেছেন রেনুকা।
রেণুকা জানান, প্রশিক্ষণের আগে উপকূলীয় অঞ্চলে চাষাবাদের বিশেষ প্রক্রিয়া সম্পর্কে কিছুই জানতেন না তিনি। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি বুঝতে পেরেছেন, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ কীভাবে ফলন এবং আয়কে প্রভাবিত করতে পারে।
প্রশিক্ষণে শেখা পদ্ধতি অনুসরণ করে রেনুকা তার বসতভিটার জমিতে সবজি চাষ শুরু করেন। বাড়ির আঙিনাতেই রোপণ করেন মিষ্টি কুমড়া, লাউ, ব্রকলি, স্কোয়াশ, বিটরুট, মুলা, ওলকপি, ফুলকপি এবং নানা রঙের বাঁধাকপি।
রেণুকার মতে, কোন সময়ে কোন সবজি চাষ করতে হয় এবং কীভাবে পরিচর্যা করতে হয়, তার সব প্রক্রিয়াই তিনি শিখেছেন অ্যাডাপ্টেশন ক্লিনিক থেকে। একইসঙ্গে সবজির ভালো দাম পেতে স্থানীয় বাজারের চাহিদাকেও বিবেচনায় রেখেছিলেন তিনি।
তিনি বলেন, “ ‘অপরাজেয় দেশ’ কর্মসূচি থেকে পাওয়া বীজ আর সার দিয়ে প্রায় ৫০ জাতের সবজি ফলাতে পেরেছি আমি। এছাড়া সাপ্তাহিক আবহাওয়া আপডেটের কল, এসএমএস আর পরামর্শগুলো আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। কখন কোন ফসলের চারা রোপণ করতে হবে আর কখন ফসল কাটতে হবে, এমন অনেক সমস্যার সমাধান দিয়েছে এসব পরামর্শ। এই কর্মসূচি আমার পরিবারকে প্রকৃত অর্থেই বদলে দিয়েছে।”
সঠিক উপকরণ, জ্ঞান এবং সমর্থন পেলে কৃষিতেও যে স্থিতিশীল ও সহনশীল জীবিকা গড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, রেণুকা যেন তারই এক জীবন্ত উদাহরণ হয়ে উঠেছেন।
সফল এই চাষি এখন নিজের চাষাবাদ ছাড়াও এলাকার অন্য নারীদেরও এ ধরণের সুযোগ কাজে লাগাতে উৎসাহিত করছেন। একইসঙ্গে রেণুকা তার ব্যবহারিক অভিজ্ঞতাগুলো ভাগ করে নিচ্ছেন সবার সঙ্গে। নিজের মতো পুরো এলাকাকেই স্বাবলম্বী করে তুলতে চান তিনি।
বাগেরহাটের শরণখোলা, মোড়লগঞ্জ, মোংলা ও রামপাল উপজেলায় রেণুকার মতো প্রায় ৩,৭০০ কৃষক জলবায়ু-সহিষ্ণু বীজ, জৈব সার এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তির সহায়তা পাচ্ছেন ‘অপরাজেয় দেশ’ প্রকল্প থেকে। এই কর্মসূচির অধীনে প্রদর্শনীর মাধ্যমে অভিযোজনমূলক চাষাবাদ পদ্ধতি তুলে ধরার পাশাপাশি সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে ডিজেলের ওপর নির্ভরতা ও খরচ কমিয়ে আনার পদ্ধতিও শেখানো হচ্ছে।
এই প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা স্থায়ী ও ভ্রাম্যমাণ ‘অ্যাডাপ্টেশন ক্লিনিক’ ফসলের ব্যবস্থাপনা, মাটির স্বাস্থ্য এবং পোকা দমন বিষয়ে ‘রিয়েল-টাইম’ বা তাৎক্ষণিক পরামর্শ সেবা প্রদান করে যাচ্ছে। এছাড়া বর্তমানে ৪,০০০-এরও বেশি কৃষক আবহাওয়া-ভিত্তিক ভয়েস মেসেজ পাচ্ছেন, যা পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে কৃষিকাজে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করছে।
(পিআর/এসপি/সেপ্টেম্বর ০৬, ২০২৬)
