ঢাকা, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » প্রবাসের চিঠি » বিস্তারিত

ফোবানাকে ব্যক্তি নয়, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান

২০২৬ সেপ্টেম্বর ০৭ ১৭:২২:৪৭
ফোবানাকে ব্যক্তি নয়, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান

ইমা এলিস, লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে : ফেডারেশন অব বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশন্স ইন নর্থ আমেরিকা (ফোবানা)-কে ব্যক্তিকেন্দ্রিক সংগঠন নয়, বরং একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন সংগঠনটির নির্বাহী কমিটির চেয়ারপার্সন রবিউল করিম বেলাল।

স্থানীয় সময় রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) লস অ্যাঞ্জেলেসে ফোবানার বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) দেওয়া সাংগঠনিক বক্তব্যে তিনি বলেন, নেতৃত্ব পরিবর্তন হবে, কিন্তু নেতৃত্ব পরিবর্তনের সঙ্গে যেন সংগঠনের অভিজ্ঞতা, আর্থিক শৃঙ্খলা, নীতিমালা, তথ্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হারিয়ে না যায়।

তিনি বলেন, ফোবানা কোনো ব্যক্তির সংগঠন নয়। কোনো চেয়ারপার্সনের নয়, কোনো নির্বাহী সচিবের নয়, এমনকি কোনো একটি নির্বাহী কমিটিরও নয়। ফোবানা একটি প্রতিষ্ঠান।

নির্বাহী কমিটির সদস্য সচিব খালে আহমেদ রউফের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত উক্ত সভায় চেয়ারপার্সন রবিউল করিম বেলাল বলেন, এজিএমকে শুধু সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আত্মসমালোচনা, মূল্যায়ন ও জবাবদিহিতার কার্যকর মঞ্চে পরিণত করতে হবে। কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়িত না হলে তার কারণ ব্যাখ্যা, দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জবাবদিহি এবং আর্থিক বিষয়ে অস্পষ্টতা থাকলে তা পরিষ্কার করার সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

তিনি বলেন, প্রশ্ন করাকে বিরোধিতা এবং গঠনমূলক সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং মতপার্থক্যকে গণতান্ত্রিক সংগঠনের শক্তি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

ভিশন ২০৪০ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

ফোবানাকে আগামী কয়েক দশকের জন্য আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও টেকসই প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে 'ফোবানা ভিশন ২০৪০' নিয়ে কাজ চলছে বলে জানান চেয়ারপার্সন।

তিনি বলেন, ভিশন ২০৪০ কোনো ব্যক্তির পরিকল্পনা বা বর্তমান নির্বাহী কমিটির মেয়াদভিত্তিক কর্মসূচি নয়। এর আওতায় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল সদস্যপদ, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থা, সাংগঠনিক কমপ্লায়েন্স, অভিযোগ ও নৈতিকতা পর্যালোচনা, নতুন নেতৃত্ব তৈরি এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ধারাবাহিকতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

প্রতিবছর শুধু একটি সফল সম্মেলন আয়োজন নয়, বরং একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাই ফোবানার লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।

নির্বাচন ও সদস্যপদে স্বচ্ছতার তাগিদ

ফোবানার নির্বাচন ও সদস্যপদ ব্যবস্থায় আস্থা তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে রবিউল করিম বেলাল বলেন, সদস্য সংগঠনের যোগ্যতা স্পষ্ট করা, সদস্যপদ নবায়নের তথ্য ডিজিটালি সংরক্ষণ, ভোটারের যোগ্যতা আগে থেকে যাচাই এবং প্রার্থীদের জন্য সমান নিয়ম নিশ্চিত করতে হবে।

নির্বাচন এমনভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত, যাতে বিজয়ীর পাশাপাশি পরাজিত পক্ষও ফলাফলকে গ্রহণ করতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একটি স্বাধীন ও গ্রহণযোগ্য অভিযোগ ও নৈতিকতা পর্যালোচনা ব্যবস্থা গড়ে তোলারও প্রস্তাব দেন তিনি। অভিযোগ ব্যক্তিগত সম্পর্ক, রাজনৈতিক অবস্থান বা গ্রুপিংয়ের ভিত্তিতে নয়, বরং তথ্য, প্রমাণ ও নির্ধারিত নিয়ম অনুসারে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত বলে তিনি মত দেন।

তরুণ ও নারী নেতৃত্বে গুরুত্ব

ফোবানার ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের বাংলাদেশি-আমেরিকানদের আরও বেশি সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানান চেয়ারপার্সন। তিনি বলেন, তরুণদের শুধু অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানালেই নেতৃত্ব তৈরি হবে না; তাদের দায়িত্ব দিতে হবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রকল্প পরিচালনায় যুক্ত করতে হবে।
প্রযুক্তি, শিক্ষা, আইন, স্বাস্থ্য, ব্যবসা, কর্পোরেট ব্যবস্থাপনা ও সামাজিক নেতৃত্বে নতুন প্রজন্মের অভিজ্ঞতাকে ফোবানার কাজে লাগানোর পাশাপাশি নারী নেতৃত্বের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

উপদেষ্টা পরিষদ বা সিনেট গঠনের প্রস্তাব

ভিশন ২০৪০-এর অংশ হিসেবে একটি স্থায়ী উপদেষ্টা পরিষদ বা সিনেট ধরনের কাঠামো গঠনের বিষয়েও আলোচনার প্রস্তাব দেন রবিউল করিম বেলাল।

তিনি বলেন, এর উদ্দেশ্য নির্বাহী কমিটির ক্ষমতা কমানো বা নতুন কোনো ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরি করা নয়। বরং প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা, নীতিগত পরামর্শ, সাংগঠনিক ইতিহাস সংরক্ষণ, দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা এবং প্রয়োজনে নিরপেক্ষ তদারকির ব্যবস্থা করাই হবে এর লক্ষ্য।

তিনি ভবিষ্যতের ফোবানাকে তিনটি স্তরে দেখতে চান—নির্বাহী কমিটি নেতৃত্ব ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবে, উপদেষ্টা পরিষদ বা সিনেট উপদেষ্টা পরিষদ বা সিনেটধারাবাহিকতা, পরামর্শ ও তদারকির দায়িত্বে থাকবে, আর এজিএম ও সাধারণ সদস্যপদ হবে সর্বোচ্চ সাংবিধানিক কর্তৃত্ব।

সাংগঠনিক নথি ডিজিটাল করার পরিকল্পনা

ফোবানার অতীতের সিদ্ধান্ত, অডিট, নীতিমালা, সদস্য সংগঠনের ইতিহাস এবং আইনি ও সাংগঠনিক নথি সংরক্ষণের জন্য একটি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক সংগ্রহশালা ও ডিজিটাল শাসনব্যবস্থা তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

একই সঙ্গে আগামী এক বছরে সাংগঠনিক নথি ডিজিটাল করা, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়ানো, সদস্যপদ যাচাই ও নবায়ন আধুনিক করা, নতুন প্রজন্মকে নেতৃত্বে যুক্ত করা, বিভিন্ন কমিটির কার্যক্রম মূল্যায়ন এবং ভিশন ২০৪০-এর বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ তৈরির অঙ্গীকারের কথা বলেন তিনি।

রবিউল করিম বেলাল বলেন, ফোবানায় প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত ব্যক্তি বা পদ নিয়ে নয়, বরং কে সংগঠনের জন্য ভালো নীতি দিতে পারেন, নতুন প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করতে পারেন এবং প্রতিষ্ঠানকে আরও স্বচ্ছ ও শক্তিশালী করতে পারেন—তা নিয়ে।

বক্তব্যের শেষ দিকে তিনি বলেন, অতীত থেকে শিক্ষা নেব, বর্তমানকে দায়িত্বশীলভাবে পরিচালনা করব এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলব।

তিনি আরও বলেন, শুধু পরবর্তী সম্মেলন সফল করার চিন্তা করলে একটি অনুষ্ঠান তৈরি হবে; কিন্তু ২০৪০ এবং তার পরবর্তী প্রজন্মের কথা চিন্তা করলে একটি ইতিহাস তৈরি করা সম্ভব।

'ব্যক্তি নয়—প্রতিষ্ঠানকে বড় করি, পদ নয়—দায়িত্বকে বড় করি, প্রতিযোগিতা নয়—অবদানকে বড় করি, আর নেতৃত্ব নয়—উত্তরাধিকার তৈরি করি' - বলেন ফোবানা নির্বাহী কমিটির চেয়ারপার্সন রবিউল করিম বেলাল।

সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন- ফোবানার নির্বাহী কমিটির চেয়ারপার্সন রবিউল করিম বেলাল, সচিব খালেদ আহমেদ রউফ, সহ সভাপতি মোহাম্মদ রহমান জহির, আহবায়ক কমিটির আহবায়ক ড. জয়নাল আবেদীন, নির্বাহী সচিব ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ ইকবাল, সাবেক চেয়ারপারসন মাসুদ চৌধুরী রব, অ্যাটর্নি মোহাম্মদ আলমগীর, রেহান রেজা, সাবেক আহবায়ক হাসমত মোবিন, জসিম উদ্দিন, ডিউক খান, আব্দুস সাত্তার, নাহিদুল খান সাহেল, মাহবুবুর রহিম ভুঁইয়া, নির্বাহী কমিটির কোষাধ্যক্ষ মাহিন উদ্দিন দুলাল, সাকিরা আলী বাচ্চি, কাজী নাহিদ ও যুগ্ম সাধারন সম্পাদক আন্থনি গমেজ পিউস।

(আইএ/এসপি/সেপ্টেম্বর ০৭, ২০২৬)