ঢাকা, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » দেশের খবর » বিস্তারিত

কোর্ট ফি জালিয়াতি মামলার পুণঃতদন্ত সিআইডিতে

আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে এসে পিওন সিরাজুলের অস্বীকার

২০২৬ সেপ্টেম্বর ০৭ ১৯:০১:৪৩
আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে এসে পিওন সিরাজুলের অস্বীকার

রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : কোটি কোটি টাকার কোর্ট ফি জালিয়াতির মূল হোতা সাতক্ষীরার তালা সহকারি জজ আদালতের অফিস সহায়ক (পিওন) মোঃ সিরাজুল ইসলামকে একদিনের রিমাণ্ড শুনানি শেষে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।

আজ সোমবার মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা গোয়েন্দা, অপরাধ ও তদন্ত শাখার উপপরিদর্শক সাইফুল ইসলাম রিমাণ্ড শেষে আদালতে সোপর্দ করলে সিরাজুল ইসলাম আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে এসে পরে বিচারক বিলাস মণ্ডলের খাস কামরায় যেয়ে অস্বীকার করেন।

গ্রেপ্তারকৃত সিরাজুল ইসলাম সাতক্ষীরার শ্যানগর উপজেলার জয়নগর গ্রামের আব্দুর রহমানের ছেলে ও বর্তমানে শহরের ফুড অফিস মোড় এলাকার বাসিন্দা।

২০২১ সালের পহেলা জুলাই সদর থানায় কালিগঞ্জ সহকারি জজ আদালতের সেরেস্তাদার মমতাজ বেগমের দায়েরকৃত ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে দায়েরকৃত জিআর-৪৫২/২১ নং মামলা থেকে জানা যায়, ২০২১ সালের ২৯ এপ্রিল কালিগঞ্জ সহকারি জজ আদালতে ৮৭/২১ নং মামলাটি দাখিল করা হয়। ওই মামলায় দুটি ক্রমিকে তিন হাজার টাকা করে ছয় হাজার টাকা কোর্ট ফি দাখিল করা হয়। দাখিলকৃত কোর্ট ফি ভিন্ন প্রকৃতির বা জ্বাল মর্মে সন্দেহ হওয়ায় জেলা ট্রেজারী অফিস বরাবর প্রতিবেদন তলব করেন ওই আদালতের সেরেস্তাদার মমতাজ বেগম। ওই বছরের ২০ জুন ট্রেজারী অফিস থেকে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। প্রতিবেদনে দাখিলকৃত কোর্ট ফি ট্রেজারী অফিস থেকে উত্তোলন করা হয় নাই মর্মে উল্লেখ করা হয়। ফলে উহা জাল মর্মে প্রতীয়মান হয়। জাল কোর্ট ফি প্রস্তুত, ক্রয়-বিক্রয় ও ব্যবহারের সাথে এক বা একাধিক ব্যক্তি জড়িত থাকতে পারে মর্মে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়। এ মামলায় কারো নাম উল্লেখ করা হয়নি।

সাতক্ষীরা আদালত সূত্রে জানা গেছে আইনজীবী সহকারি কেরামত আলীকে মামলার পরপরই পুলিশ গ্রেপ্তার করে। কেরামত আলী আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। তাতে সে ওই কোর্ট ফি জজ কোর্টের স্টাম্প ভেন্ডর সাতক্ষীরা সদর উপজেলার আলীপুর চাপারডাঙি গ্রামের ফাইজুল ইসলামের ছেলে রাজীবুল্লাহ’র কাছ থেকে কিনেছেন মর্মে উল্লেখ করে ওই কোর্ট ফি রাজীবুল্লাহ তার দুলা ভাই জজ কোর্টের পিওন সিরাজুল ইসলামের কাছ থেকে পেয়েছেন মর্মে উল্লেখ করে। পরবর্তীতে রাজীবুল্লাহ গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান। পরে রাজীবুল্লাহ জামিনে মুক্তি পেলেও তার নিয়োগকর্তা এক বিচারকের নাম ভাঙিয়ে পুলিশকে ম্যানেজ করে নিজের কর্মস্থলে কাজ করে যাচ্ছিলেন সিরাজুল ইসলাম। জেলা গোয়েন্দা সংস্থার পুলিশ পরিদর্শক ফরিদ আহম্মদ ২০২৩ সালের ৩০ মে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।অভিযোগপত্রে সিরাজুল ইসলাম, কেরামত আলী ও রাজীবুল্লাহকে আসামী শ্রেণীভুক্ত করা হয়। অভিযোগপত্রে সিরাজুলকে খুঁজে পাননি বলে উল্লেখ করেন তদন্তকারি কর্মকর্তা। মামলায় সাক্ষী করা হয় ১০জনকে।

অভিযোগপত্রে ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর আদালত অভিযোগপত্র গৃহীত হয়। ওই দিন আদালতের কাঠগোড়ায় কেরামত ও রাজীবুল্লাহ উপস্থিত থাকলেও সকল আসামী হাজির বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়। ২০২৫ সালের ১৫ নভেম্বর মামলার আমলগ্রহণ করা হলেও সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ না দিয়েই বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-২ এ বদলী করা হয়। এরপরও সিরাজুল ইসলামের বিশেষ তৎপরতায় মামলার নথি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। একপর্যায়ে সম্প্রতি বিষয়টি আদালতের নজরে এলে গত ৩০ এপ্রিল সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে বিচারিক আদালতে (ট্রাইব্যনাল-২) পাঠানো হয়। ওইদিনই জেলা ও দায়রা জজ এর সেরেস্তাদারের মাধ্যমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কপি পুলিশ কোর্টে পাঠানো হয়। ১৫ মে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কপি পুলিশ কোর্ট থেকে সাতক্ষীরা পুলিশ সুপার ও শ্যামনগর থানায় পাঠানো হয়। সে অনুযায়ী গত ২০ মে বুধবার দুপুরে আদালত চত্বরের বাইরে থেকে সিরাজুলকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পরবর্তীতে সিরাজুল জেলা ও দায়রা জজ আদালতে জামিন আবেদন করেন। গত ২৭ আগষ্ট মামলার অভিযোগ গঠণ ও জামিন শুনানির দিনে মামলাটি ২৫ কার্য দিবসের মধ্যে গোয়েন্দা, অপরাধ ও তদন্ত (সিআইডি) শাখার সাতক্ষীরার কর্মকর্তাকে পূর্ণঃতদন্তের নির্দেশ দেন বিচারক মোঃ নজরুল ইসলাম। মামলার তদন্তভার পেয়ে গোয়েন্দা অপরাধ ও তদন্ত শাখার পুলিশ উপপরিদর্শক সাইফুল ইসলাম গত ২ সেপ্টেম্বর সিরাজুলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে চার দিনের রিমাণ্ড আবেদন করেন। সাতক্ষীরার অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম বিলাস মণ্ডল ৩ সেপ্টেম্বর শুনানি শেষে তাকে এক দিনের রিমাণ্ড মঞ্জুর করেন। রবিবার কারাগার থেকে সিরাজুলকে গোয়েন্দা, অপরাধ ও তদন্ত শাখার সাতক্ষীরা কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সোমবার সকালে তাকে আদালতের গারদখানায় রাখা হয়। বিকেলে অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাাকিম বিলাস মণ্ডলের খাস কামরায় হাজির করা হলে সিদ্ধান্ত বদল করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে অস্বীকার করেন।

মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা গোয়েন্দা, অপরাধ ও তদন্ত শাখার পুলিশের উপপরিদর্শক সাইফুল ইসলাম জানান, সিরাজুল ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে রাজী হয়ে পরে বিচারকের কাছে অস্বীকার করে তদন্তকারি কর্মকর্তার কাছে প্রতারণা করেছে।

এদিকে সিরাজুল ইসলামকে গ্রেপ্তারের পর জানা যায় যে, ২০০৪ সালের ৭ অক্টোবর গাইবান্ধা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে সিরাজুল ইসলাম নৈশপ্রহরী হিসেবে যোগদান করেন। তখন তার বেতন ছিল ১৫০০ থেকে ২৪০০ টাকা। বর্তমানে অফিস সহায়ক বা পিওন হিসেবে বেতন ১৯ হাজার ৩২০ টাকা। তিনি চার বছর আগে শহরের ফুড অফিস মোড়ে ৪৫ লাখ টাকা ব্যয়ে আড়াই কাঠা জমি কিনেছেন। তাকে ৫ তলা ফাউণ্ডেশনের বাড়ি বানাচ্ছেন। মাছখোলায় ২৫ কাঠা জমি কেনার পাশাপাশি নিজের ও স্ত্রীর নামে পর্যাপ্ত টাকা সঞ্চয় করেছেন। ফলে তার এত টাকা আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন এখন আদালত পাড়াসহ শহরের সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। তারা সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুদককে তদন্ত করার আহবান জানিয়েছেন।

এদিকে সিরাজুল ইসলাম সোমবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর দুই কোটি টাকারও বেশি জাল কোর্ট ফি কিনে বিপদে পড়া শতাধিক আইনজীবী ও আইনজীবী সহকারির মধ্যে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়তে দেখা যায়।

(আরকে/এসপি/সেপ্টেম্বর ০৭, ২০২৬)