ঢাকা, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত

অন্য একটি দেশের আবদার রক্ষা করা এত জরুরি কেন?

২০২৬ সেপ্টেম্বর ০৮ ১৭:৩৪:০৪
অন্য একটি দেশের আবদার রক্ষা করা এত জরুরি কেন?

চৌধুরী আবদুল হান্নান


একজন মন্ত্রী বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আবদার রক্ষায় মার্কিন কোম্পানি বোয়িংয়ের তৈরি উড়োজাহাজ কেনা হচ্ছে কিন্ত প্রতিমন্ত্রী বলেন, চাপে নয়, প্রয়োজনে কেনা হচ্ছে।

পরস্পর বিরোধী এমন বক্তব‍্যের কোনটি বিশ্বাস করবে মানুষ? তবে সত‍্য বুঝতে কারও বিলম্ব হয় না, পোড় খাওয়া মানুষ এখন সব বুঝতে পারে। রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার দায় প্রতিটি নাগরিকের বহন করতে হয়।

সুপার পাওয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘আবদার’ রক্ষা না করে উপায় আছে? যুক্তরাষ্ট্র কারও বন্ধু নয়, স্বার্থ রক্ষায় তারা সব কিছু করবে, প্রয়োজনে বল প্রয়োগ। অনেকেই ‘বুদ্ধিমান’ ঘাড় ধরার আগেই সব মেনে নেবে।

বর্তমান বিশ্বে অনেক দেশের ক্ষমতায় যাওয়া এবং টিকে থাকা আমেরিকার সন্তষ্টির ওপর নির্ভর করে।ট্রাম্প প্রশাসন যদি বাংলাদেশকে শুল্ক কমিয়ে দেওয়ার লোভনীয় আশ্বাস দিয়ে ‘আবদার’ করে আমদানি-রফতানি বানিজ‍্য এককভাবে তাদের সাথে করতে হবে, তখন কী হবে? দুটি দেশের মধ‍্যে দূরত্ব প্রায় ১৩ হাজার কিলোমিটার, দূরত্ব যত বেশি আমদানি ব‍্যয়ও বেশি। কেবল রাজনৈতিক কারণে বা আনুগত‍্য প্রকাশের জন‍্য পণ‍্য আমদানি চালু রাখা কতটা আত্মঘাতি হয় হয়, তা ভাবার সময় হয়েছে।

পক্ষান্তরে পার্শবর্তী দেশ ভারতের সাথে আমদানি ও রপ্তানি বানিজ‍্য উভয়ই লাভজনক। সংকট কালে ভারত থেকে কাঁচা মরিচ আমদানির অনুমতি দেওয়ার খবর প্রকাশের পরই দর অর্ধেকে নেমে আসে। ব‍্যবসার মূল উদ্দেশ‍্য লাভবান হওয়া, অন‍্যকে খুশি করা নয়।

মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত এবং এ দেশে আশ্রীত প্রায় ১৩ লক্ষ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়ার একটি ষড়যন্ত্র তো বিদ‍্যমান আছেই, এখন বড় কোনো শক্তি মানবতার দোহাই দিয়ে একটু ধাক্কা দিলেই হয়।

রোহিঙ্গারা মুসলমান আর আমরাও মুসলমান এবং সব মুসলমান ভাই ভাই। মানবতার পক্ষে কাজ করে অনেকে মহান হতে চাইবেন, শান্তির দূত হিসেবে জাতিসংঘে যদি একটি পদ পাওয়া যায়।

একটি স্বাধীন দেশ যত ছোটই হোক, তার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে সম্মানের সাথে চলার অধিকার আছে। পৃথিবীতে কোনো দেশ একা চলতে পারে না, দ্বি-পাক্ষিক বা বহু-পাক্ষিক সম্পর্ক রক্ষা করার দরকার হয়। কিন্ত নতজানু নীতি গ্রহণ করা একটি স্বাধীন দেশের জন‍্য কতটা অবমাননাকর, তা ব‍্যাখ‍্যা করার প্রয়োজন নেই। বন্ধুত্ব ও কূটনৈতিক শিষ্ঠাচার বজায় রেখে বাংলাদেশ নিশ্চয় সর্বোচ্চ সুবিধাটা নেওয়ার চেষ্টা করবে। তবে দায়িত্ব দিতে হবে দক্ষতা ও মেধার ভিত্তিতে, কেবল আনুগত‍্যের ভিত্তিতে নয়।

অতীতে আমরা অবাক হয়ে নতজানু পররাষ্ট্রনীতি দেখেছি, বিগত আওয়ামী স্বৈরচারী সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক অনুষ্ঠানে গর্বের সাথে বলেছিলেন, তিনি ইন্ডিয়া সফরে গিয়ে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে বলেছেন। তার এমন অপরিপক্ক বক্তব‍্য মানুষকে হতবাক করেছিল, অবশ‍্য তার এমন কথার স্বপক্ষে ব‍্যাখ‍্যা দিয়ে তার দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা ঢাকার চেষ্টা করেছিলেন কিন্ত ততক্ষণে হাস‍্যকর বক্তব‍্য ভাইরাল হয়ে গিয়েছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় আশংকা প্রকাশ করেছিল, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন বক্তব‍্য বিদ‍্যমান ভারত বিরোধী শক্তি নতুন করে প্ররোচনা পাবে। অপেক্ষাকৃত দুর্বল পক্ষ শক্তিশালীকে সমীহ করে চলবে, এটাই প্রচলিত রীতি। প্রকৃতিতেও দুর্বলেরা অনবরত সংগ্রাম করেই টিকে থাকে।

বিশ্ব ব‍্যবস্থার বর্তমান বাস্তবতায় প্রতিটি দেশই নিজ স্বার্থ রক্ষা করে অপরাপর রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক রাখে কিন্ত সেক্ষেত্রে কেবল পরাশক্তির মন জোগানো নয়। রাজনৈতিক নেতাদের কথা বলার সময় অনেক সতর্ক ও কৌশলী হতে হয়।

একবার শিক্ষমন্ত্রী ছাত্রদের ফার্মের মুরগি বলায় দেশব‍্যাপী তীব্র ছাত্র-আন্দোলন শুরু হয়েছিল, সরকারকেই অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছিল। সর্বোচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করলেই চৌকস রাজনীতিক হওয়া যায় না, দেশ পরিচালনা তো দূরের কথা।

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান তো উচ্চশিক্ষিত এবং বিশ্বব‍্যাপী খ‍্যাতিসম্পন্ন ব‍্যক্তি ছিলেন, তিনি কি একটি দেশ পরিচালনায় সক্ষমতা দেখাতে পেরেছেন?

আমরা কত উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করি, বিদ‍্যা অর্জন করি, কত সার্টিফিকেট আমাদের, জ্ঞান ভান্ডার পূর্ণ কিন্ত এত জ্ঞান দিয়ে আমরা কী করবো, যদি না থাকে কান্ডজ্ঞান।

স্বৈর সরকার এখন অতীত, অথর্ব অন্তর্বর্তী সরকারও বিদায় হয়েছে, এখন গণতান্ত্রিক নির্বাচিত সররার ক্ষমতায়, তাদের কাছে মানুষের প্রত‍্যাশা অনেক।

সরকারের ভিতর থাকা কান্ডজ্ঞানহীন মন্ত্রী ও উচ্চ পর্যায়ে থাকা কর্মকর্তাদের কীভাবে কথা বলতে হয় তা শেখাতে হবে। কারণ তারা অনবরত কথা বলতে চান, গণমানুষের ভাষা বুঝতে পারেন না।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ডিজিএম, সোনালী ব‍্যাংক।