ঢাকা, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » পাঠকের লেখা » বিস্তারিত

সমালোচনা ও আত্মসমালোচনার সংকটে বাংলাদেশের রাজনীতি 

২০২৬ সেপ্টেম্বর ০৯ ১৭:৫১:৪৭
সমালোচনা ও আত্মসমালোচনার সংকটে বাংলাদেশের রাজনীতি 

মোঃ আজিজুল হুদা চৌধুরী সুমন


আজকের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় সংকট কি আদর্শের, নেতৃত্বের, নাকি জনগণের আস্থার? প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে গেলে আরেকটি বিষয় সামনে আসে—আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের সমালোচনা কতটা গ্রহণ করতে পারে এবং নিজেদের ভুল স্বীকার করার মতো রাজনৈতিক সাহস কতটা রাখে?

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাজনৈতিক দল শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার একটি মাধ্যম নয়; রাজনৈতিক দল হচ্ছে জনগণের মতামত, আকাঙ্ক্ষা, দাবি ও প্রত্যাশাকে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিতে রূপ দেওয়ার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান। তাই একটি রাজনৈতিক দলের ভেতরে যেমন নেতৃত্বের প্রতি আস্থা থাকা প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন প্রশ্ন করার স্বাধীনতা, ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ এবং ভুল সিদ্ধান্তের সমালোচনা করার পরিবেশ।

কিন্তু বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন। কোনো রাজনৈতিক দল বা তার নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠলেই সেটিকে অনেক সময় ব্যক্তিগত আক্রমণ, দলবিরোধিতা কিংবা ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখার প্রবণতা দেখা যায়। ফলে গঠনমূলক সমালোচনার জায়গা সংকুচিত হয়, আর তার জায়গা দখল করে নেয় প্রশংসা, চাটুকারিতা ও অন্ধ আনুগত্য।

সমালোচনা আর বিরোধিতা এক বিষয় নয়। বিরোধিতা হতে পারে রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ; কিন্তু গঠনমূলক সমালোচনা হতে পারে একই রাজনৈতিক পরিবারের ভেতর থেকেও। একজন কর্মী যখন দলের ভুল সিদ্ধান্তের কথা বলেন, একজন সমর্থক যখন নেতৃত্বের কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কিংবা একজন নাগরিক যখন কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডের অসঙ্গতি তুলে ধরেন—তখন তাকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করার পরিবর্তে তার বক্তব্যের যৌক্তিকতা যাচাই করা উচিত।

কারণ রাজনৈতিক দল কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। দল জনগণের সমর্থন, কর্মীদের শ্রম এবং রাজনৈতিক আদর্শের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। সেই দলের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার কর্মী, সমর্থক ও নাগরিকদের রয়েছে।

দুঃখজনক হলো, অনেক সময় রাজনৈতিক দলগুলো প্রশংসা শুনতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। চারপাশে এমন মানুষ তৈরি হয় যারা নেতৃত্বের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে প্রমাণ করতে ব্যস্ত থাকে। ভুল সিদ্ধান্ত হলেও সেখানে প্রশ্ন থাকে না, আপত্তি থাকে না, বিকল্প মত থাকে না।ফলে নেতৃত্ব বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে।

একটি রাজনৈতিক দলের পরিপক্বতার অন্যতম মাপকাঠি হলো—সে দল নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে কি না।

ভুল করা অপরাধ নয়। ভুল বুঝতে না চাওয়া, ভুল স্বীকার না করা এবং ভুল থেকে শিক্ষা না নেওয়াই বড় সমস্যা।

রাজনীতিতে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়, জনগণের প্রত্যাশা পরিবর্তিত হয়, রাজনৈতিক কৌশল পরিবর্তিত হয়। কোনো সিদ্ধান্ত একসময় সঠিক মনে হলেও পরবর্তী সময়ে সেটি ভুল প্রমাণিত হতে পারে। তখন রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব হলো বাস্তবতাকে স্বীকার করা এবং প্রয়োজন হলে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা।

কিন্তু আত্মসমালোচনার অভাবে অনেক দল অতীতের ভুল সিদ্ধান্তকে যুক্তি দিয়ে রক্ষা করতে গিয়ে আরও বড় ভুলের পথে এগিয়ে যায়। ভুল ঢাকার জন্য নতুন ব্যাখ্যা তৈরি হয়, ব্যর্থতার দায় অন্যের ওপর চাপানো হয় এবং শেষ পর্যন্ত দলীয় কর্মীদের কাছেও সত্যিকার পরিস্থিতি অস্বচ্ছ হয়ে ওঠে।এভাবে একটি রাজনৈতিক দলের ভেতরে আত্মশুদ্ধির প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়।

রাজনীতিতে চাটুকারিতা অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ একজন নেতা যদি চারপাশে শুধু প্রশংসাকারীদের দেখতে পান, তাহলে তিনি বাস্তবতার অনেকটাই হারিয়ে ফেলেন।

চাটুকার কখনো নেতাকে প্রকৃত অবস্থা জানায় না। সে নেতার পছন্দের কথাই বলে। ফলে নেতা যা শুনতে চান, সেটিই শুনতে থাকেন; কিন্তু জনগণ কী ভাবছে, মাঠের কর্মীরা কী বলছে কিংবা সাধারণ মানুষের মধ্যে দলের গ্রহণযোগ্যতা কোথায় কমছে—এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আড়ালে থেকে যায়।একসময় নেতৃত্বের কাছে দলের বাস্তব চিত্রের বদলে তৈরি হয় একটি কৃত্রিম চিত্র।আর এই কৃত্রিম বাস্তবতা রাজনৈতিক দলের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

যে নেতা শুধু প্রশংসা শুনতে চান, তিনি হয়তো কিছুদিন স্বস্তিতে থাকতে পারেন; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তিনি নিজের রাজনৈতিক শক্তির প্রকৃত অবস্থান বুঝতে ব্যর্থ হবেন।

রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই দলীয় শৃঙ্খলার কথা বলে। অবশ্যই দলীয় শৃঙ্খলা প্রয়োজন। কিন্তু শৃঙ্খলা আর অন্ধ আনুগত্য এক জিনিস নয়।

দলের সিদ্ধান্ত মেনে চলা এবং দলের ভুল নিয়ে প্রশ্ন করার অধিকার—এই দুটি বিষয় পরস্পরের বিরোধী নয়।

বরং একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংগঠনে অভ্যন্তরীণ আলোচনা যত বেশি হবে, সিদ্ধান্ত তত বেশি পর্যালোচিত হবে। ভিন্নমতকে জায়গা দিলে ভুল সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা কমে। নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন থাকলে তা দলের ভেতরেই আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যায়।

কিন্তু ভিন্নমতকে যদি অপরাধ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে কর্মীরা ধীরে ধীরে কথা বলা বন্ধ করে দেন। নেতারা তখন আর প্রকৃত মতামত পান না। সবাই শুধু নেতার মন রক্ষার চেষ্টা করেন।সেখান থেকেই শুরু হয় সাংগঠনিক স্থবিরতা।

রাজনৈতিক দল শুধু নিজেদের কর্মীদের সমালোচনা নয়, সাধারণ মানুষের সমালোচনাও গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করবে—এটাই গণতান্ত্রিক রাজনীতির দাবি।

ভোটার কোনো দলের স্থায়ী সম্পত্তি নয়। জনগণ কোনো রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করতে পারে, আবার সেই দলের কর্মকাণ্ডে হতাশ হয়ে সমর্থন প্রত্যাহারও করতে পারে।তাই জনগণের ক্ষোভ, হতাশা, প্রশ্ন কিংবা সমালোচনাকে অবজ্ঞা করা রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী।

রাজনীতিবিদদের মনে রাখতে হবে—জনগণকে বোঝানো যায়, কিন্তু জনগণকে চিরদিন উপেক্ষা করা যায় না।একটি দল যদি বারবার মানুষের অভিযোগকে অস্বীকার করে, নিজেদের ব্যর্থতার কথা স্বীকার না করে এবং প্রতিটি সমালোচনার পেছনে ষড়যন্ত্র খুঁজতে থাকে, তাহলে একসময় জনগণই সেই দলের সবচেয়ে বড় জবাব হয়ে দাঁড়ায়।

আমরা প্রায়ই গণতন্ত্রকে নির্বাচন, ভোট ও ক্ষমতার পালাবদলের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখি। কিন্তু গণতন্ত্রের প্রকৃত চর্চা রাজনৈতিক দলের ভেতর থেকেই শুরু হওয়া উচিত।একটি দল যদি রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলে, অথচ নিজের সাংগঠনিক কাঠামোর ভেতরে ভিন্নমত সহ্য করতে না পারে, তাহলে সেই গণতন্ত্রের দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্য—প্রশ্নটি থেকেই যায়।

গণতন্ত্র মানে শুধু নিজের কথা বলার অধিকার নয়; অন্যের কথা শোনার মানসিকতাও গণতন্ত্রের অংশ।

লেখক : লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।