প্রচ্ছদ » দেশের খবর » বিস্তারিত
সাংবাদিক রিয়াজুল রিয়াজ ও পুলিশের চেষ্টায় মা-বাবার কোলে ফিরলো নিখোঁজ ফয়সাল
২০২৬ সেপ্টেম্বর ০৯ ১৯:১৫:৫২
মো. সজীব, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার : দৈনিক 'বাংলা ৭১' ও 'উত্তরাধিকার ৭১ নিউজ' এর বিশেষ প্রতিনিধি রিয়াজুল রিয়াজ, গাজীপুর সদর থানা পুলিশ ও ফরিদপুর কোতয়ালি থানা পুলিশের একান্ত চেষ্টায় মা-বাবার কোলে ফিরে গেলেন নিখোঁজ মাদ্রাসা শিক্ষার্থী মানসিক প্রতিবন্ধী ফয়সাল আহমেদ (২০)। গাজীপুর পোড়াবাড়ি এলাকার একটি দালিখ মাদ্রাসার ১০ম শ্রেনীর ছাত্র ফয়সাল আহমেদ গাজীপুরের জয়দেবপুর থানার অন্তর্গত হাতিয়ার গ্রামের আব্দুল করিম ও ফাহিমা খাতুনে একমাত্র পুত্র সন্তান, এবং তাঁদের তিন সন্তানের মধ্যে ফয়সাল সবার ছোট। বিগত চার মাস যাবত ফয়সাল বাবার সাথে অভিমান করে বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয়েছিলো বলে জানিয়েছে তার পরিবার।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সকালে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ফয়সালকে তার মা-বাবার নিকট হস্তান্তর করেছে ফরিদপুর কোতয়ালি থানা পুলিশ এর আগে, গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় রাস্তা থেকে উদ্ধার হওয়া ফয়সাল আহমেদকে কোতয়ালি থানার পুলিশের নিকট হস্তান্তর করেন ফরিদপুরে কর্মরত দৈনিক 'বাংলা ৭১' ও 'উত্তরাধিকার ৭১ নিউজ' এর বিশেষ প্রতিনিধি সাংবাদিক রিয়াজুল রিয়াজ।
সর্বগা রাষ্ট্র ও জনস্বার্থে আপোষহীন মানবিক এ সংবাদ কর্মী উত্তরাধিকার ৭১ নিউজকে এ বিষয়ে জানান, সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যার একটু আগ মুহুর্তে বিদ্যুৎ না থাকায় ফরিদপুরের কানাইপুরে আমার বঢ়ক্তিগত চেম্বারের বারান্দায় (ফরিদপুর-মাগুরা মহাসড়কের পাশে) চেয়ারে বসে লেখালেখি করছিলাম। এমন সময় স্থানীয় দুই যুনক টাইপের লোক ফয়সালকে আমার কাছে নিয়ে এলেন। তারা জানালেন, 'স্যার এ ছেলেটির খিদে লেগেছে তাকে একটু খাবারের ব্যাবস্থা করা যাবে'? আমি তাদের পরিচয় জানতে চাইলে তারা বললেন, 'স্যার আমরা এখানের স্থানীয় কিন্তু এ ছেলেটা (ফয়সাল) এখানে ঘুরাফেরা করছিলো। ওর নাম জানালো ফয়সাল বাড়ী গাজীপুর। নাম ও গাজীপুর ছাড়া সে কিছুই বলতে পারেনা। তবে খুব খিদে লাগছে বললো। রাস্তার ওপর পাশের কয়েকটি দোকানে সাহায্য চাইলাম, সবাই বললো আপনার কাছে নিয়ে আসতে তাই নিয়ে আসলাম।'
দীর্ঘদিন ক্রাইম, রাষ্ট্র ও জনস্বার্থ রক্ষায় কাজ করে যাওয়া এ অনুসন্ধানী সাংবাদিক আরও জানান, 'অতঃপর ওই দুই যুবকের একজনকে পাশের একটি হোটেল থেকে ফয়সালের জন্য খাবার আনতে পাঠিয়ে বিদ্যুৎ আসায় তাদেরকে চেম্বারে নিয়ে আসলাম। খাওয়া-দাওয়া শেষে ফয়সালের সাথে কথা করলাম। কিন্তু ও ছেলেটি তার নাম আর গাজীপুর ছাড়া কিছুই বলতে আসলেই পারছে না বা এর বইরে কিছু বলছে না। তাছাড়া তার মুখের ভাষাও স্পষ্ট নয়। বেশির ভাগ সময় প্রশ্ন করলেই শুধু হাসে। এবার আমি আমার অভিজ্ঞতা কাছে লাগিয়ে ওকে কাছে বসিয়ে আদরের সূরে বাবা সম্বোধন করে কিছু প্রশ্ন করলাম। এরপর কয়েকটি নতুন শব্দ তার মুখ থেকে বের করতে সক্ষম হলাম। যেমন: 'কোনাবাড়ি: সাবিরিয়া দাখিল মাদ্রাসা, দশম শ্রেনী ও তার বাবার নাম আব্দুল করিম ইত্যাদি।
রিয়াজ আরও জানান, এরপর আমি গাজীপুর কোনাবাড়ী থানার ওসিকে ফোনে বিষয়টি অবগত করলে তিনি জানালেন, 'কোনাবাড়িতে এ নামে কোনো দাখিল মাদ্রাসা নেই। তবে পোড়াবাড়ি এলাকায় এ নামে একটা মাদ্রাসা আছে। কিন্তু সেটা গাজীপুর সদর থানার মধ্যে'। পরে তাঁর থেকে বিদায় নিয়ে গাজীপুর সদর থানার ওসি আমিনুল ইসলামকে ফোন করে বিষয়টি অবগত করি। তিনি ফয়সালের একটি ছবি তুলে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাতে বললেন এবং জানালেন তিনি ওই ঠিকানায় পুলিশ পাঠাচ্ছেন। একটু পরেই রাজিব চৌধুরী নামের গাজীপুর সদর থানার একজন এএসআই আমাকে হোয়াটসঅ্যাপ এ সালাম দিয়ে তাঁর পরিচয় জানালেন। আমি তাঁকে ফোন ব্যাক করলে তিনি জানালেন, 'আমার সাথে গাড়ী আছে, পাঁচ-দশ মিনিট লাগবে ওই এলাকায় পৌঁছাইতে। আমি এই সময়ের মধ্যে এএসআই রাজিব চৌধুরীকে ফয়সাল থেকে শুনে আরও কয়েকটি ইনফরমেশন পাঠালাম। রাজিব চৌধুরী কিছুক্ষণ পর আমাকে জানালেন, 'মাদ্রাসা আছে, কিন্তু ছুটি হয়ে গেছে কোনো শিক্ষক নেই। গার্ডসহ স্থানীয়দের তার ছবি দেখেছি। তারা কয়েকজন বলছেন চেনা-চেনা লাগছে কিন্তু কেউ পুরোপুরি চিনতে পারছেন না। আমি হতাশ হয়ে ভাবলাম কি করা যায় এখন। এরই মধ্যে বেশ কয়েকবার ফয়সাল ওঠে দাঁড়িয়েছে চলে যাবে বলে। কই যাবে জিজ্ঞেস করলে কিছুই বলছে না। আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম। কি করা যায়? পরে ফয়সালের একটা ভিডিও পাঠালাম রাজিব চৌধুরীকে। এরপর আমি তাঁকে ফোন দিয়ে বললাম আরেকটু দেখবেন প্লিজ। ওই পুলিশ কর্মকর্তা আমাকে আশ্বস্ত করে উত্তর দিলেন, 'আপনি টেনশন কইরেন না। আমি খুঁজে বের করবোই। তাঁর আত্নবিশ্বাসে একটু স্বস্তি পেলাম। এদিকে ফয়সাল থাকবে না কিছুতেই। আমি বুঝিয়ে বললাম বাবা তুমি কি তোমার বাবা মায়ের নিকট যেতে চাও না? ছেলেটি হ্যা সূচক মাথা নাড়ালে আমি তাকে বললাম- তাহলে একটু বসো, তোমার মা-বাবাকে নিয়ে পুলিশ আসছে। ফয়সাল এরপর আর যাওয়ার কথা বলেনি, ও শুধু একটু পরপর জিজ্ঞেস করেছে, :কখন আসবে?'
সাংবাদিক রিয়াজুল রিয়াজ আরও জানান, এরপর কোতয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুল হাসানকে ফোন করলাম এ জন্য যে, যদি গাজীপুর সদর থানা পুলিশ ফয়সালের পরিচয় শনাক্তে সক্ষম না হয়, সেক্ষেত্রে তাঁরা এ ব্যাপারে কিছু করতে পারবেন কিনা, সেটা জানতে চাইলাম। তিনি আশ্বস্ত করে জানালেন, আপনার ওইদিকে শামীম নামে আমাদের একজন এসআই কাজে গিয়েছেন। ফেরার পথে বললো নিয়ে আসতে। আমি জিজ্ঞেস করলাম আমি কি তাঁকে চিনি? তিনি জানালেন নাও চিনতে পারেন, তিনি নতুন জয়েন করেছেন। আমি তাঁকে আপনার সাথে যোগাযোগ করতে বলবো।
এ সাংবাদিক আরও বলেন, এরই মধ্যে গাজীপুর সদর থানার এএসআই রাজিব চৌধুরী জানালেন, ফয়সালের এক মামাকে পেয়েছি। তিনি তাঁকে ফোন ধরিয়ে দিলেন। ইসমাইল হোসেন নামে ফয়সালের ছোট মামা তাঁর পরিচয় দিয়ে ফয়সাল সম্পর্কে জানালেন, ও কিছুটা পাগলাটে টাপপের। কথা কম বলে। বাবার ওপর রাগ করে বাড়ি থেকে পালিয়েছে। তিনি অনুরোধ করলেন ফয়সালের বাবা-মা না পৌঁছানো পর্যন্ত তাকে একটু রাখতে। আমি বললাম, 'আস্থা ঠিক আছে, আপনি পুলিশ কর্মকর্তাকে দিন। পরে এএসআই রাজিব চৌধুরীকে তাঁদের থানা থেকে অফিসিয়ালি ফরিদপুর কোতয়ালি থানায় সাথে যোগাযোগ করে ফয়সালের মা-বাবাকে ওইখানে পাঠিয়ে দিতে অনুরোধ করলাম। আমি কোতয়ালি থানা পুলিশকে বিষয়টি অবগত করে তাদের হেফাজতে পাঠিয়ে দিচ্ছি বলে জানালাম।
রিয়াজ আরও জানান, এরপর কোতয়ালি থানার ওসিকে ফোন করে না পেয়ে ওই সময় কর্মরত ডিউটি অফিসার ও থানা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) পীযুষ কান্তি হালদারকে ফোন করে উপরোক্ত সব বিষয়েঅবগত করলাম। পীযুষ কান্তি হালদার বললেন, এএসআই মিজানুর রহমানকে পাঠাচ্ছি, আপনার নম্বরও তাকে দিয়ে দিচ্ছি। তিনি গিয়ে আপনার অফিস থেকে ওকে নিয়ে আসবে। এর কিছুক্ষণ পরে এসআই পীযুষ আবারও ফোন করে জানালেন গাজীপুর থানা থেকে ফোন করেছিলো এএসআই মিজানুর রহমান যাচ্ছেন আপনার নিকট। আমি এএসআই মিজানুর কে ফোন দিয়ে আমার চেম্বারের ঠিকানা জানালাম।
সাংবাদিক রিয়াজুল রিয়াজ আরও জানান, এরপর এএসআই মিজানুর রহমান আসলে থানার ডিইউটি অফিসার পীযুষ কান্তি হালদারের সাথে কথা বলে তাঁর নিকট ফয়সালকে হস্তান্তর করলাম। যাওয়ার আগে ফয়সালকে রাতের খাবার পার্সেল করে দিয়ে দিলাম। আর এ পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ করতে আমার ও দুই থানা পুলিশের দুই ঘন্টা সময় লেগেছে।
রিয়াজুল রিয়াজ আরও জানান, ওই রাতে গাজীপুর থানা পুলিশ, কোতয়ালি থানা পুলিশের কর্মকর্তাদের সাথে একে ওপরকে ধন্যবাদ জ্ঞাপনের পাশাপাশি ফয়সালের পরিবারের সাথে কথা হয়। মঙ্গলবার সকালে ঘুম ভাঙে ফয়সালের মায়ের ফোনে। তিনি জানান, আমি ও ফয়সালের বাবা কোতয়ালি থানায় এসেছি ভোর বেলা। কিন্তু কারোর সাথে যোগাযোগ করতে পারছি না। আমি একটু ওয়েট করতে বলে ওসি মাহমুদুল হাসান ও এএসআই মিজানুর রহমানকে ফোন করে ফয়সালের বাবা-মায়ের থানায় অবস্থানের বিষয়টি অবগত করি ও ফয়সালের মায়ের ফোন নম্বরটি হোয়াটসঅ্যাপে সেন্ড করি। অতঃপর থানা পুলিশ তাঁদের সাথে যোগযোগ করে ফয়সালকে তার পরিবারের নিকট হস্তান্তর করে কোতয়ালি থানা পুলিশ।
এভাবে, সাংবাদিক ও পুলিশের মাত্র দুই ঘন্টার প্রচেষ্টায় মা-বাবার চার মাসের অনিশ্চিত প্রতীক্ষার অবসান ঘটে। প্রতিবন্ধী ফয়সাল ফিরে যায় তার আপন ঠিকানায়।
(এস/এসপি/সেপ্টেম্বর ০৯, ২০২৬)
