প্রচ্ছদ » তথ্য-প্রযুক্তি » বিস্তারিত
মানবজাতির অস্তিত্ব হুমকির মুখে ফেলবে এআই!
২০২৬ সেপ্টেম্বর ১১ ১৩:৩৪:৩৪
নিউজ ডেস্ক : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন শুধু প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বা ছবি তৈরি করার প্রযুক্তি নয়। কোড লেখা, গবেষণা, তথ্য বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে সাইবার নিরাপত্তা বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্রুত সক্ষমতা বাড়াচ্ছে এআই। আর এই দ্রুত অগ্রগতিই নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে প্রযুক্তি গবেষকদের মধ্যে।
অ্যানথ্রোপিকের নিরাপত্তা গবেষক ইভান হাবিঙ্গারের দাবি, আগামী এক দশকের মধ্যে এআইয়ের কারণে মানুষের অস্তিত্ব ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এমনকি মানবজাতির বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ১০ শতাংশের বেশি বলেও তিনি মনে করেন।
তবে এটি কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়; বরং এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে একজন গবেষকের ব্যক্তিগত মূল্যায়ন। বর্তমানে ব্যবহৃত এআই মডেলগুলোর ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম হলেও, ভবিষ্যতে প্রযুক্তিটি কত দ্রুত এবং কোন পর্যায়ে পৌঁছাবে, সেটিই তার মূল উদ্বেগ।
কী নিয়ে এত ভয়?
ইভান হাবিঙ্গার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্যটি করেন অ্যানথ্রোপিকের সাবেক গবেষক জেকব কক্সনের একটি পোস্টের প্রতিক্রিয়ায়। কক্সন আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, এআই কোম্পানিগুলো এমন সিস্টেম তৈরি করছে, যেগুলো অল্প সময়ের মধ্যেই মানুষের তুলনায় অনেক বেশি সক্ষম হয়ে উঠতে পারে।
এ ধরনের অতিমানবীয় এআই যদি নিজে থেকে সাইবার হামলা চালাতে পারে, গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে কিংবা নিজের সক্ষমতা বাড়ানোর মতো কাজ করতে পারে, তাহলে পরিস্থিতি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে ভবিষ্যতে ঠিক কোন পথে এআই মানবজাতির জন্য অস্তিত্বগত হুমকি তৈরি করতে পারে, সে বিষয়ে হাবিঙ্গার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।
সবচেয়ে বড় সমস্যা ‘এআই অ্যালাইনমেন্ট’
এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে ‘এআই অ্যালাইনমেন্ট’। সহজভাবে বললে, এআইকে এমনভাবে তৈরি করা, যাতে তার আচরণ মানুষের উদ্দেশ্য, নিরাপত্তা ও মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে।
হাবিঙ্গারের মতে, সুপারইন্টেলিজেন্স বা মানুষের তুলনায় অত্যন্ত শক্তিশালী এআই তৈরি হলে সেটিকে কীভাবে নিরাপদ ও মানুষের নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে, সেই সমস্যার পূর্ণ সমাধান এখনও নেই। তার আশঙ্কা, প্রযুক্তির উন্নয়নের গতি যদি নিরাপত্তা গবেষণার চেয়ে দ্রুত হয়, তাহলে পরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে যেতে পারে।
এআই নিয়ে এমন সতর্কবার্তা অবশ্য নতুন নয়। ওপেনআই, অ্যানথ্রোপিক এবং মেটা-সহ বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষকেরাও এআইয়ের অপব্যবহার এবং অত্যন্ত শক্তিশালী মডেলের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এআই এজেন্টের সক্ষমতা বাড়ার কারণে। এআই এজেন্ট শুধু নির্দেশের উত্তর দেয় না; নির্দিষ্ট অনুমতি পেলে নিজে থেকে একাধিক ধাপে কাজও করতে পারে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে এআই ব্যবহারের মাধ্যমে সাইবার হামলা বা হ্যাকিংয়ের ঘটনার কথা প্রকাশ করেছে। এতে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, ভবিষ্যতের আরও শক্তিশালী এআই যদি অপরাধীদের হাতে যায়, তাহলে সাইবার আক্রমণের মাত্রা অনেক বেড়ে যেতে পারে।
এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ে আলোচনায় শুধু প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর দায়িত্ব নয়, সরকারের ভূমিকাও সামনে এসেছে। সাবেক ব্রিটিশ সরকারি কর্মকর্তা ড্যারেন জোন্স এআইয়ের নিরাপদ বিকাশ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন চুক্তির আহ্বান জানিয়েছেন।
তার যুক্তি, বিভিন্ন দেশের সরকার যদি এখন থেকেই এআইয়ের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ না করে, তাহলে প্রযুক্তির অগ্রগতির গতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যেখানে ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় সময়ই আর থাকবে না।
অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের এআই সিকিউরিটি ইনস্টিটিউড বা এআইএসআই-এর কাছে অ্যানথ্রোপিকের সর্বশেষ মডেল যথেষ্ট তথ্যসহ সরবরাহ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যদিও অ্যানথ্রোপিক এ বিষয়ে মন্তব্য করেনি। ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এআই মডেলকে নিরাপদ করার বিষয়ে তারা অ্যানথ্রোপিকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে।
এআই কি সত্যিই মানবজাতিকে ধ্বংস করবে?
এই প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর এখন কারও কাছে নেই। এআই নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্কও এখন আর শুধু প্রযুক্তিটি ঝুঁকিপূর্ণ কি না, তা নিয়ে নয়; বরং ঝুঁকির মাত্রা কতটা এবং সেটি নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, তা নিয়ে।
অ্যানথ্রোপিকের নিজস্ব নিরাপত্তা মূল্যায়নেও বলা হয়েছে, অত্যন্ত সক্ষম এআইয়ের কিছু ঝুঁকি এখনও কম বলে মনে হলেও ভবিষ্যতের দ্রুত অগ্রগতি নিয়ে আগের তুলনায় তাদের আত্মবিশ্বাস কমেছে। সংস্থাটি সম্ভাব্য দ্রুত অগ্রগতির কিছু প্রাথমিক লক্ষণের কথাও উল্লেখ করেছে।
তাই ‘এআই মানবজাতিকে ধ্বংস করবেই’ এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো প্রমাণ এখন নেই। তবে প্রযুক্তির ক্ষমতা যত দ্রুত বাড়ছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক নীতিমালা তৈরি না হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে গবেষকদের সাম্প্রতিক সতর্কবার্তার মূল বার্তা সেটিই।
তথ্যসূত্র : বিবিসি
(ওএস/এএস/সেপ্টেম্বর ১১, ২০২৬)
