ঢাকা, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » দেশের খবর » বিস্তারিত

সাপের বন্ধু মামছু

তিন দশকে ১০ হাজার সাপ উদ্ধার করে সুন্দরবনে ছেড়েছে শামছু 

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১১ ১৮:৪৩:৫৪
তিন দশকে ১০ হাজার সাপ উদ্ধার করে সুন্দরবনে ছেড়েছে শামছু 

# সাপের কামড় খেয়েছেন ৫০০ বার

# মেলেনি সরকারি স্বীকৃতি, পাননি সামাজিক নিরাপত্তা সহায়তা

# শরীরে শক্তি থাকা পর্যন্ত উদ্ধার করবেন সাপ

শেখ আহসানুল করিম, বাগেরহাট : বাগেরহাটে কোনো তন্ত্র-মন্ত্র বা নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই তিন দশক ধরে বিষধর বা নির্বি সাপ ধরার ভয়ঙ্কর কাজটিই করে চলেছেন এক নিবেদিত পরিবেশকর্মী হতদরিদ্র সাপ বন্ধু শামছু তালুকদার (৬২)। মানুষের বাসাবাড়ি, অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ক্ষেত-খামার ও ঝোপঝাড়ে সাপের উপস্থিতির খবর পেলোই সেখানে ছুটে যান তিনি। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞাতা আর অসাধারণ কৌশল খাটিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে খালি হাতে সাপ ধরে ফেলেন অনায়াসেই। পরে সেসব সাপ ছেড়ে দেন সুন্দরবনে। তিন দশক ধরে এভাবে প্রায় ৫০০ বার কামড় খেয়ে ১০ হাজারের অধিক সাপ ধরে সুন্দরবনে অবমুক্ত করেছেন। বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার রায়েন্দা ইউনিয়নের চালরায়েন্দা গ্রামের আমজেদ তালুকদারের ছেলে শামছু সব ধরনের সাপ উদ্ধার করে মানুষের জীবন রক্ষা আর বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ করে চলেছেন। এলাকাবাসির কাছে তিনি এখন সাপের বন্ধু হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।

সাপের বন্ধু শামছু তালুকদার বলেন, গত ৩০ বছরে সাপ উদ্ধার করেছেন ১০ হাজারের অধিক। যেখানেই সাপের খবর পান, দিন-রাত, ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ছুটে যান সেখানে। তবে মানুষের জীবন রক্ষার এই কাজে কখনো দাবি করেন না পারিশ্রমিক। খুসি হয়ে কেউ কিছু দিলে গ্রহন করেন, না দিলেও অভিযোগ নেই তার। সাপের পেছনে ছুটে বেশিরভাগ সময় চলে যায়। তাই স্থায়ীভাবে করতে পারেন না অন্য কোনো কাজও। নিজের কোনো জমি নেই। বেড়িবাঁধের পাশে সরকারি জমিতে ছোট্ট একটি টিনের ঘর তুলে বসবাস করেন। অভাব-অনটন লেগেই থাকে স্ত্রী-সন্তানসহ চার সদস্যের সংসারে।

শামছুর জানালেন, ভারতের কামরূপ-কামাক্ষ্যায় ছিলেন ১৮বছর। সেখান থেকেই রপ্ত করেছেন সাপ ধরার দক্ষতা ও কৌশল। দেশে ফিরে সেই দক্ষতাকেই কাজে লাগিয়েছেন পরিবেশ ও মানুষের সেবায়। সাপ ধরার কোনো তন্ত্র-মন্ত্র নেই। কৌশলই সব। কোনটি বিষধর আর কোনটি নির্বিষ সাপ, তা চেনার অভিজ্ঞাতা থাকায় আরো সহজ হয়েছে সাপ ধরা তার। যে কারণে বিষধর কোনো সাপের ছোবল এখন পর্যন্ত পড়েনি তার শরীরে। তবে, নির্বিষ সাপের কামড় খেয়েছেন অন্তত ৫০০বার, জানালেন শামছু।

শামছু আক্ষেপ করে বলেন, দীর্ঘ তিন দশক ধরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাপ ধরে মানুষ ও পরিবেশের উপকার করলেও মেলেনি সরকারি স্বীকৃতি, পাননি আর্থিক সহায়তাও। ভাগ্যে জোটেনি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কোনো সুবিধাও। তারপরও যতদিন শরীরে শক্তি থাকবে, ততদিন সাপ উদ্ধারে নিজেকে উৎসর্গ করবেন। শুধু চাওয়া একটাই তার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে তিন বেলা খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা।

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও সুরক্ষা সংগঠন ওয়াইল্ড টিমের শরণখোলা ফিল্ড ফ্যাসিলিটেটর মো. আলম হাওলাদার বলেন, শামছু তালুকদার সাপ ধরায় খুবই পারদর্শী। প্রতি বছর ৩০০ থেকে ৩৫০টি নানা প্রজাতির সাপ ধরে সুন্দরবনে অবমুক্ত করেন। খবর পেলেই কোনো বিনিময় ছাড়াই ছুটে যান সাপ উদ্ধারে। মানুষ আগে সাপ দেখামাত্রই পিটিয়ে মেরে ফেলতো। কিন্তু তার কারণে সাপ মারার প্রবনতা কমেছে অনেকটাই। তার কারণে এখন রক্ষা পাচ্ছে পরিবেশ বান্ধব অসংখ্য সাপের জীবন। তার এমন মহৎ কাজের স্বীকৃতি এবং আর্থিক সহায়তা দেওয়ার দাবি জানাই সরকারের কাছে।

বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, শামছুর ব্যক্তিগত এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কাজ করছেন তিনি। পরিবেশকর্মী সাপ বন্ধু শামছুর জন্য বন বিভাগের পক্ষ থেকে সহযোগিতার চেষ্টা করা হবে বলেও জানান ডিএফও।

(এস/এসপি/সেপ্টেম্বর ১১, ২০২৬)