প্রচ্ছদ » পাঠকের লেখা » বিস্তারিত
আমার অনুভবে আমীরুল ইসলাম
২০২৬ সেপ্টেম্বর ১১ ১৮:৫৪:৩৩
আবদুল হামিদ মাহবুব
আমীরুল ইসলামের সঙ্গে আমার একবার দেখা হয়েছিল বটে। কিন্তু কোনো কথা হয়নি। বলা যেতে পারে, দূর থেকে তাঁকে দেখেছিলাম, কিন্তু কথা বলার সুযোগ হয়নি। পরবর্তীতে অবশ্য মোবাইল ফোনে দুদিন তাঁর সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল। দুবারই তিনি আমাকে ফোন করেছিলেন। সেই দুদিনের কথাই আজ আমার কাছে তাঁর সঙ্গে আমার সবচেয়ে বড় স্মৃতি। মানুষটির সঙ্গে আমার খুব বেশি পরিচয় ছিল না, ঘনিষ্ঠতাও ছিল না, অথচ তাঁর চলে যাওয়ার সংবাদে কেন যেন মনে হচ্ছে, নিজের খুব একজন বন্ধুকে হারালাম। হয়তো বড় মানুষদের সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা সব সময় দেখা সাক্ষাৎ আর দীর্ঘ আলাপের ওপর নির্ভর করে না। কখনো কখনো দুটি ফোনালাপও একজন মানুষকে হৃদয়ের খুব কাছাকাছি নিয়ে আসে।
সালটা আমার এখন আর সঠিক মনে নেই। গিয়েছিলাম বাংলা একাডেমির অমর একুশে বইমেলায়। ঘুরতে ঘুরতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছিল। সঙ্গে আমার স্ত্রী ও সন্তান। একসময় আমরা চ্যানেল আইয়ের বই নিয়ে যে অনুষ্ঠান করা হতো, সেই আয়োজনের কাছাকাছি চলে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল লুৎফর রহমান রিটনের সঙ্গে। রিটন আমার পূর্বপরিচিত। তাঁর সঙ্গে কয়েকবার দেখা হয়েছে। সেই চিঠি লেখার যুগে চিঠির মাধ্যমেও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। আমার শহরেও রিটন এসেছেন। ফলে তাঁকে পেয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই গল্প জমে গেল। আমার স্ত্রী ও সন্তানকেও তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলাম। কথা বলতে বলতে আমার ছোট ভাই আবু মকসুদের প্রসঙ্গ চলে এল। সে লন্ডনে থাকে এবং লেখালেখি করে। রিটন লন্ডনে গিয়ে সম্ভবত মাকসুদের বাসায় এক রাত থেকেও ছিল। আমার ভাতিজি, মকসুদের মেয়ে মৌরীকে উৎসর্গ করে রিটন একটি ছড়ার বইও লিখেছে। রিটন তখন আমাকে সেই বইটির কথা মনে করিয়ে দিল। আসলে তখনো আমি বইটি দেখিনি। এইসব কথাবার্তার মধ্য দিয়ে বেশ খানিকটা সময় কেটে যাচ্ছিল।
হঠাৎ এমন এক ধমকা বাতাস এল যে, মুহূর্তের মধ্যে চারপাশের দৃশ্যপট বদলে গেল। চ্যানেল আইয়ের অনুষ্ঠানের পেছনে যে ভারী বোর্ডটি থাকত, তাতে অনুষ্ঠানের নাম ও মনোগ্রাম ছিল, সেটি হঠাৎ ঠাস করে পড়ে গেল। হয়তো মাত্র কয়েক ইঞ্চির জন্য বোর্ডটি রিটনের গায়ে লাগেনি। যদি লাগত, তাহলে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারত। বোর্ডটি পড়ে যাওয়ার শব্দে আমাদের গল্পে ছেদ পড়ল। রিটনও ভয় পেয়ে কেমন যেন হয়ে গেল। আমার সঙ্গে গল্প করতে গিয়ে এমন একটি বিপদের মধ্যে সে প্রায় পড়ে গিয়েছিল। সেই মুহূর্তে বোর্ডটি পড়ে যাওয়ার ঘটনাটি আমাদের কাছে নিছক একটি দুর্ঘটনা মনে হলেও, আজ এত বছর পর পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, সেই ঘটনাই যেন আমার সঙ্গে আমীরুল ইসলামের প্রথম দেখা হওয়ার গল্পটিকে একটি অদ্ভুত স্মৃতিতে পরিণত করে দিয়েছে।
সেই সময় রিটন আমাকে বলেছিল, টুলুর সঙ্গে কথা বলে জান। আমি তো টুলুকে চিনি না। জিজ্ঞেস করলাম, টুলু কে? রিটন বলল, আমীরুল ইসলামের ডাকনাম টুলু। তখনো আমি জানতাম না, বাংলা সাহিত্যের যে মানুষটিকে একদিন এত দূর থেকে দেখব, তাঁর সঙ্গে আমার জীবনে মাত্র দুদিনের ফোনালাপই হয়ে থাকবে। এদিকে তখন অন্ধকার হয়ে আসছে। মেলার মাঠে আলো জ্বলে উঠেছে। আমাদেরও ফিরতে হবে। এমনিতেই অনেক বই কেনায় আমার স্ত্রী, সন্তান এবং আমার হাতে ভারী ভারী ব্যাগ। তাই বললাম, আজ আর আমীরুল ইসলামের সঙ্গে দেখা করছি না। পরে যখন আসব, তখন না হয় সবার সঙ্গে বসে গল্প হবে। রিটন তখন আঙুল দিয়ে দূরে একজন মানুষকে দেখিয়ে বলেছিল, ওই যে আমীরুল। সেই দূরের মানুষটিই হয়ে রইলেন আমার কাছে আমীরুল ইসলাম। সেটিই ছিল তাঁকে আমার প্রথম এবং শেষ সামনাসামনি দেখা। দূর থেকে দেখা। কথা না বলা দেখা।
তারপর কত বছর কেটে গেল। সময় তার নিজের নিয়মে মানুষকে দূরে সরিয়ে নেয়, আবার কখনো অদ্ভুত কোনো সূত্র ধরে কাছে নিয়ে আসে। আমার ছোট ছেলেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে বিয়ে করল। তারপর বউকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেল। আমাদের লেখক যাযাবর মিন্টু একদিন আমাকে ফোন করলেন। বললেন, আমীরুল ভাই আমার কিছু বই চেয়েছেন। তিনি শিশু সাহিত্যিকদের নিয়ে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা লিখছেন। যাযাবর মিন্টু তাঁর প্রকাশনী 'পালক' থেকে আমার বেশ কিছু বই প্রকাশ করেছেন। তাঁকে বললাম, পালক থেকে যে বইগুলো প্রকাশ হয়েছে, সেগুলো আমীরুল ভাইকে দিয়ে দিতে পারেন। তিনি জানালেন, সব বইয়ের কপি হয়তো তাঁর কাছেও এখন খুঁজে পাবেন না। আমি বললাম, যেগুলো পান, সেগুলোই দেন। আমার কাছেও তো সব বইয়ের কপি নেই। তখনো আমি জানতাম না, এই বই চাওয়ার মধ্য দিয়েই একজন বড় লেখকের সঙ্গে আমার জীবনের এক অপূর্ব স্মৃতির দরজা খুলে যাচ্ছে।
কিছুদিন পর একদিন সম্ভবত নাফে নজরুল অথবা যাযাবর মিন্টুই ফোন করে আমাকে বললেন, আপনার সঙ্গে একজন কথা বলতে চান। আমি নাম জিজ্ঞেস করলাম, কে কথা বলবেন? তিনি বললেন, আপনি কথা বলে জেনে নিন। এরপর মোবাইল ফোনটি ওপাশের মানুষটির হাতে দিয়ে দিলেন। ভরাট গলায় একজন বেশ উঁচু স্বরে বললেন, "আমি আমীরুল।" কথাটি শুনেই আমি যেন অন্য এক আবেগের মধ্যে চলে গেলাম। এত বড় মাপের একজন লেখক আমার সঙ্গে কথা বলছেন! আমি তাঁর কুশলাদি জানতে চাইলাম। বুঝতে পারলাম, প্রাণখোলা হাসি দিয়ে তিনি বলছেন, সব ঠিক আছে, খুব ভালো আছি। তারপর হঠাৎ বললেন, "স্যার!" শব্দটি শুনে আমি একটু হতচকিত হলাম। আবারও তিনি আমাকে "স্যার" বলে সম্বোধন করলেন। বললেন, "আপনার তিন চারটা বই আমি পড়েছি। আপনি তো ছড়ায় দুর্দান্ত সব কাজ করেছেন।" এত বড় একজন লেখকের মুখে এমন প্রশংসা শুনে আমার শরীর ঘামতে শুরু করল। আমি বিনয় প্রকাশ করে বললাম, এই টুকটাক লিখি। লেখা ছাড়া আর কিছু তো শিখিনি।
তিনি আবার বললেন, "স্যার, আমি আপনার লেখা নিয়ে একটি আলোচনা লিখতে চাই।" আমি বললাম, সে তো আমার পরম পাওয়া। সেই সঙ্গে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি আমাকে 'স্যার' ডাকছেন কেন? তিনি আবার হো হো করে হেসে বললেন, "আপনি যেসব কাজ করেছেন, স্যার তো ডাকবই। এই জগতের সবাই আপনাকে স্যার ডাকবে।" আমি লজ্জায় যেন কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম। বললাম, আমীরুল ভাই, আমাকে স্যার ডাকবেন না। আমাকে ভাই বলুন। তিনি সেই "স্যার" বলেই বললেন, "স্যার, আপনি অনুমতি দিলেন তো!" আমি বললাম, আপনার যা মনে চায় আপনি লিখুন। তাঁর কণ্ঠে যে আন্তরিকতা ছিল, তাতে মনে হচ্ছিল তিনি কোনো আনুষ্ঠানিক সৌজন্য করছেন না। তিনি সত্যিই আমার লেখাকে তাঁর ভালো লেগেছে বলেই এই কথাগুলো বলছেন। একজন বড় মানুষের কাছ থেকে পাওয়া এই অকৃত্রিম স্বীকৃতি যে একজন ছোট লেখকের মনে কত গভীর আলো জ্বালিয়ে দিতে পারে, সেদিন আমি তা নিজের ভেতর দিয়ে অনুভব করেছিলাম।
এরপর তিনি আমার লেখা নিয়ে বেশ দীর্ঘ একটি আলোচনা লিখে ফেললেন। সেটি একটি পত্রিকায় ছাপাও হলো। পত্রিকায় লেখাটি প্রকাশিত হওয়ার পর তিনি আবার আমাকে সরাসরি ফোন করলেন। তাঁর নম্বরটি আগেই আমার মোবাইলে সেভ করে রেখেছিলাম। দ্রুত ফোন রিসিভ করলাম। তিনি আমার কাছে জানতে চাইলেন, পত্রিকায় লেখাটি পড়েছি কি না। আমি বললাম, পড়েছি। সেই সঙ্গে এ কথাও বললাম, আপনি আমাকে নিয়ে এত প্রশংসা লিখেছেন! তিনি বললেন, "এটা আপনার প্রাপ্য। আমিও ছড়া নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করি। আপনার লেখাও দেখলাম। আমাকে ছাড়িয়ে যাওয়া পরীক্ষা নিরীক্ষায় ভরপুর।" তারপর বললেন, "লেখাটি আপনার ভালো লেগেছে জেনে, আমারও ভালো লাগল।" আমি আবার বললাম, আমাকে নিয়ে আপনি বোধ হয় একটু বাড়িয়েই লিখেছেন। তখন তিনি বললেন, "আমার বই যখন বের হবে, তখন কমিয়ে দেব না হয়।" আমি হেসেছিলাম। কতক্ষণ যে হেসেছিলাম, আজ আর মনে নেই। তবে সেই হাসির মধ্যে যে আনন্দ ছিল, তা এখনো মনে আছে। তিনি আমাকে বললেন, যাযাবর মিন্টুর মাধ্যমে তাঁর বই পাঠাবেন। আমিও যেন তাঁর লেখা নিয়ে কিছু একটা লিখি।
যাযাবর মিন্টুর স্ত্রী রোমানা ইয়াসমিন ছিলেন চোখ প্রকাশনীর কর্ণধার। তিনিও আমার "শিশুর ছড়া"সহ একাধিক বই প্রকাশ করেছেন। পরবর্তীতে সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ায় এই জগৎ থেকে সরে যান। আমার শহরে বদলি হয়ে এসে এডিএম-এর দায়িত্ব নিয়েও কয়েক মাস ছিলেন। একসময় যাযাবর মিন্টু আমীরুল ইসলামের বেশ কিছু বই আমার হাতে তুলে দিলেন। আমি বইগুলো নেড়েচেড়ে দেখেছি। তাঁর লেখার অনেকগুলো পড়েছি। কিন্তু কোথা থেকে লেখা শুরু করব, সেটি ঠিক করতে পারিনি। কারণ আমীরুল ইসলামকে একটি পরিচয়ে ধরে লেখা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। তিনি ছড়াকার, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, অনুষ্ঠান নির্মাতা, উপস্থাপক, আড্ডাবাজ, ভোজনরসিক। শিশু সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই, যেখানে তাঁর বিচরণ ছিল না। কোন পরিচয়টিকে বেশি প্রাধান্য দেব, কোন আমীরুলকে নিয়ে লিখব, সেই সাহসই হয়নি। ফলে বইগুলো পড়েও আমি লেখা শুরু করতে পারিনি। শেষ পর্যন্ত আর লেখাই হলো না। আজ মনে হচ্ছে, সেই না লেখার মধ্যে আমার এক ধরনের অপরাধবোধও রয়ে গেল।
আজ শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ভোরে আমীরুল ইসলাম ইন্তেকাল করেছেন। অথচ বুধবার রাতেই একজন ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন, তিনি মারা গেছেন। তখনই তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমি একটি পোস্ট দিয়েছিলাম। পরে জানতে পারলাম, তিনি মারা যাননি। তাঁকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছে। আজ শুক্রবার তাঁর ভেন্টিলেশন খুলে তাঁর মৃত্যুর সংবাদ প্রকাশ করা হলো। মৃত্যুর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এমনই অদ্ভুত। কখনো কখনো মানুষ চলে যাওয়ার আগেই আমাদের মনে তার বিদায়ের শূন্যতা তৈরি করে যায়। তারপর যখন সত্যিই চলে যায়, তখন মনে হয়, শূন্যতাটি যেন আরও গভীর হয়ে গেল।
এমন বিরল মানুষ পাওয়া সত্যিই কঠিন। শিশু সাহিত্যের প্রায় সব কটি শাখায় তিনি বিচরণ করেছেন। তাঁর সৃষ্টির পরিধি ছিল বিস্ময়কর। তিনি শুধু লিখেছেন তা নয়, শিশু সাহিত্য ও সংস্কৃতির নানা ক্ষেত্রকে নিজের প্রতিভা দিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন। আমার সঙ্গে তাঁর দেখা হয়নি বললেই চলে। অথচ দুদিন মোবাইল ফোনে কথা বলে আমি বুঝেছিলাম, তিনি ছিলেন একজন দিলখোলা মানুষ। তাঁর কণ্ঠে কোনো দূরত্ব ছিল না, হাসিতে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না। বড় লেখক হয়েও তিনি যে সহজে একজন অপেক্ষাকৃত ছোট লেখককে আপন করে নিতে পারেন, সেই উদারতাই আমাকে সবচেয়ে বেশি স্পর্শ করেছিল।
আর আমার জন্য তাঁর সবচেয়ে বড় উপহার তাঁর লেখা। তাঁর "শিশুসাহিত্যের চেনা অচেনা" বইয়ে আমাকে নিয়ে যে লেখাটি তিনি লিখেছিলেন, সেটি গ্রন্থিত আছে। একজন বড় মাপের লেখকের কলমে নিজের সাহিত্যকর্ম নিয়ে এমন একটি লেখা পাওয়া আমার জন্য পরম এক পাওয়া। তিনি আমাকে যে সম্মান দিয়েছেন, যে আস্থা রেখেছেন, যে ভালোবাসা দিয়ে আমার লেখা পড়েছেন এবং আমার কাজকে মূল্য দিয়েছেন, তার ঋণ শোধ করার মতো কোনো ভাষা আমার জানা নেই। আমি তাঁর বই নিয়ে লিখতে পারিনি। কিন্তু তিনি আমার লেখা নিয়ে লিখে গেছেন। এই অসম্পূর্ণতার মধ্যেও আমার জন্য একটি অমূল্য প্রাপ্তি রেখে গেছেন তিনি।
আমীরুল ভাই, আর আপনার সঙ্গে দেখা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু মনে হয়, সেই দেখা না হওয়াই হয়তো ভালো হয়েছে। দেখা হলে হয়তো আপনার কোনো মন্দ আমার সামনে বেরিয়ে আসত। আমারও অনেক মন্দ আপনার কাছে ধরা পড়তো। যেমন অনেকগুলো মন্দ লুৎফর রহমান রিটনের আমার কাছে বেরিয়ে এসেছে। আমার একটি কথা আছে, "বড় মানুষদের দূর থেকে দেখাই ভালো। কাছে গেলে মোহ ভঙ্গ হয়।" এই কথাটিকে উদ্ধৃত করে সমাজচিন্তক আহমেদ সিরাজ একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছেন। জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর লেখাটি তিনি তাঁর একটি গ্রন্থেও সংকলন করেছেন। আপনার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। কথা হয়েছে। সেই দুদিনের কথার স্মৃতি নিয়েই থাকি। আপনার প্রাণখোলা হাসির শব্দটুকু মনে রাখি। আপনার সেই "স্যার" ডাকটুকু মনে রাখি। একজন বড় মানুষ আমার লেখাকে ভালোবেসে আমাকে যে সম্মান দিয়েছিলেন, সেই স্মৃতিটুকুই থাকুক আমার কাছে।
ঢাকায় দুবার নাফে নজরুলের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। আপনার অসুস্থতার খবর নাফে নজরুলই আমাকে দিয়েছিলেন। আমাকে নিয়ে আপনার কাছে যাবেন, সেটিও বলেছিলেন। কিন্তু পাছে আমার মোহ ভঙ্গ হয়, সেই আশঙ্কায় নাফেকে এড়িয়ে গিয়েছি। মানুষ কখনো কখনো নিজের কল্পনায় একজন মানুষকে যে উচ্চতায় বসিয়ে রাখে, বাস্তবের সাক্ষাৎ সেই ছবিটিকে বদলে দিতে পারে। আমি চাইনি আপনার সঙ্গে আমার মনে তৈরি হওয়া সেই দূরের, নির্মল ছবিটা বদলে যাক। তাই দেখা হয়নি। আজ মনে হচ্ছে, দেখা না হওয়ার সেই দূরত্বটুকুই হয়তো আমার স্মৃতির সৌন্দর্য হয়ে থাকবে।
আপনি বিয়ে করেননি। কোনো এক লেখা বা সাক্ষাৎকারে পড়েছিলাম, চিত্রনায়িকা ববিতার প্রেমে আপনি যুবক বয়সে হাবুডুবু খেয়েছিলেন। হয়তো সে কারণেই আর বিয়ে করেননি। আপনার কোনো সন্তান সন্ততিও নেই। কিন্তু দুই শতাধিক গ্রন্থ আপনার হাত থেকে বাংলা ভাষাভাষী পাঠক পেয়েছে। একটি মানুষের জীবনে এর চেয়ে বড় উত্তরাধিকার আর কী হতে পারে! আপনি সংসার করেননি হয়তো, কিন্তু বাংলা ভাষার সঙ্গে আপনার যে সংসার, তার সন্তান ছড়িয়ে আছে অগণিত পাঠকের ঘরে ঘরে।
ডিজিটালের যুগ পৃথিবীকে অনেক বদলে দিয়েছে। মানুষের হাতে এখন বইয়ের পাশাপাশি মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, নানা ধরনের পর্দা। পাঠের অভ্যাসও বদলেছে। তবু আমি মনে করি, বইয়ের অবদান কখনো কমে যাবে না। একটি ভালো বই সময়কে অতিক্রম করে। একটি বই তার লেখককে তাঁর জীবনের সীমানা পেরিয়ে নিয়ে যায়। আপনার প্রতিটি বই আপনার এক একটি সন্তান। এই সন্তানরাই আপনাকে বাঁচিয়ে রাখবে শত শত বছর। কোনো মানুষই প্রকৃত অর্থে চিরকাল বেঁচে থাকে না। কিন্তু তার সৃষ্টি বেঁচে থাকে। মানুষের শরীরের মৃত্যু আছে, শব্দের মৃত্যু নেই। লেখকের জীবন থেমে যায়, লেখকের লেখা থামে না।
সকল মানুষই তো অমর হতে চায়। আপনিও আপনার লেখার মাধ্যমে অমর হবেন, এ আমার বিশ্বাস। আপনার কণ্ঠস্বর একদিন থেমে গেছে, আপনার হাসি আর ফোনের ওপার থেকে শোনা যাবে না। কিন্তু আপনার লেখা থাকবে। আপনার বই থাকবে। কোনো একদিন কোনো অচেনা শিশু আপনার লেখা পড়বে। কোনো তরুণ পাঠক আপনার গল্পের ভেতর ঢুকে যাবে। কোনো গবেষক আপনার কাজ নিয়ে লিখবেন। কোনো লেখক আপনার সৃষ্টির আলোয় নিজের পথ খুঁজবেন। সেখানেই তো একজন লেখকের দ্বিতীয় জীবন শুরু হয়।
আর লেখা বড় করছি না। শুধু শেষবারের মতো আপনাকে মনে মনে সেই দূর থেকে দেখা মানুষটির মতোই দেখি। মেলার আলোয় দাঁড়িয়ে আছেন আপনি। পাশে রিটনের আঙুলের ইশারা। আমি দূর থেকে তাকিয়ে আছি। কাছে যাইনি। কথা বলিনি। তারপর বহু বছর পর ফোনের ওপার থেকে ভেসে এসেছে আপনার ভরাট কণ্ঠ, "আমি আমীরুল।" আর তার পরেই সেই আন্তরিক সম্বোধন, "স্যার।" এই সামান্য কয়েকটি মুহূর্তই আমার কাছে আজ এক বিরাট স্মৃতি। শেষ বিদায়ের আপনাকে অভিবাদন।টুপি খোলা অভিবাদন হে বন্ধু আমীরুল ইসলাম টুলু। আপনার সঙ্গে আমার দেখা হলো না। কিন্তু আপনার লেখা আমার সঙ্গে দেখা করে গেছে। সেই দেখাই থাক। সেই স্মৃতিই থাক। আপনি বেঁচে থাকুন আপনার বইয়ের পাতায়, আপনার শব্দে, আপনার সৃষ্ট চরিত্রে, আপনার পাঠকের ভালোবাসায়। বেঁচে থাকুন শত শত বছর। অন্তে এসে আমার লেখা ছড়ার দুটি লাইন আওড়াই, এভাবে; গুণীজন মরে গিয়ে আকাশের তারা হয় /জ্বলেজ্বলে তারকায় চিরদিন জেগে রয়।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।
