ঢাকা, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » দেশের বাইরে » বিস্তারিত

ট্রাম্পকে নতুন সঙ্কটে ফেলেছে হুথিরা

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৩ ০০:৩৮:০৫
ট্রাম্পকে নতুন সঙ্কটে ফেলেছে হুথিরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরান সমর্থিত হুথিদের ঝটিকা অভিযানের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হয়েছে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর সামনে। ইরানের সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সংঘাত যখন সপ্তম মাসে গড়িয়েছে, ঠিক তখনই এই ঘটনা তার জন্য এক নতুন ও বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করেছে। শনিবার রয়টার্স এক বিশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পরিধি আরো বাড়িয়ে হুথি যোদ্ধারা ইয়েমেনের উপকূল ধরে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়েছে। এর ফলে লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে অবস্থিত বাব আল-মান্দেব প্রণালি অবরুদ্ধ করার সক্ষমতা তাদের বেড়েছে; আর এর মাধ্যমে ওই অঞ্চলের তেল পরিবহনের প্রধান দুটি পথের ওপরই তেহরান এক ধরনের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব বিস্তারের সুযোগ লাভ করেছে।

শুক্রবার হুথিরা ইয়েমেন ও আফ্রিকার মধ্যবর্তী প্রণালিতে অবস্থিত পেরিম দ্বীপে পৌঁছেছে। সৌদি আরবের জন্য এটি একটি দুঃসংবাদ; কারণ যুদ্ধের ফলে আরব উপদ্বীপের অপর প্রান্তে অবস্থিত হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশটি লোহিত সাগরের বন্দরগুলো দিয়েই তাদের অধিকাংশ তেল পরিবহন করে আসছে।

এমন এক সময়ে এই ঘটনাটি ঘটল যা ট্রাম্পের জন্য বেশ কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করেছে। তিনি ইতিমধ্যেই রেকর্ড-নিম্ন জনসমর্থনের মুখে পড়েছেন এবং এই সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার উপায় খুঁজছেন। এর সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে তিনি ইরানের সরকারকে ছাড় দিতে বাধ্য করার লক্ষ্যে একটি অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন।

এই সংঘাতের জেরে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের ওপর তার রিপাবলিকান পার্টির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার সম্ভাবনা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও ইরান তার অনমনীয় অবস্থান বজায় রেখেছে।

কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর সিনিয়র ফেলো স্টিফেন ওয়ের্থেইম বলেন, “মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই ট্রাম্প ইরানের অর্থনীতিকে চাপে ফেলার একটি কৌশল গ্রহণ করেছিলেন—যেখানে সামরিক সংঘাতের মাত্রা এমন পর্যায়ে রাখা হতো যাতে তা মার্কিন অর্থনীতিতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে। কিন্তু হুথিরা ট্রাম্পের সেই পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিয়েছে।”

সংঘাতের জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন কোনোভাবেই এমন পরিস্থিতি হতে দিতে পারে না যেখানে হুথিরা ওই সামুদ্রিক প্রণালিটি বন্ধ করে দেবে, যার ফলে জ্বালানির দাম বেড়ে যাবে এবং বিশ্ববাণিজ্য ব্যাহত হবে। তবে একই সঙ্গে, এমন এক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামা বিপজ্জনক হতে পারে—যারা অতীতে সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণ সফলভাবে মোকাবিলা করেছে। বিশেষ করে মার্কিন সামরিক বাহিনী যখন ইতিমধ্যেই অন্যান্য সংঘাতে জড়িয়ে হিমশিম খাচ্ছে, তখন নতুন এই অভিযান তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের কার্যত শাসক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বৃহস্পতিবার ট্রাম্পকে ফোন করে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মার্কিন সামরিক সহায়তা চেয়েছিলেন। সূত্রগুলো জানিয়েছে, তাকে বলা হয়েছে যে ওয়াশিংটন আপাতত সরাসরি কোনো সামরিক হস্তক্ষেপ করবে না, তবে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করবে।

ট্রাম্প শনিবার নিশ্চিত করেছেন, তিনি যুবরাজের সঙ্গে কথা বলেছেন। অবশ্য হুথিরা তার প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে ওয়াশিংটনকে এই সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে না পড়ার আহ্বান জানিয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সুনির্দিষ্ট কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানালেও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলোর ওপর, যেমন- লোহিত সাগরে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর মনোযোগ দিচ্ছে। একই সঙ্গে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও সমাধানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র তার আঞ্চলিক অংশীদারদেরই নেতৃত্ব গ্রহণে সক্ষম করে তুলতে চায়।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ওপর বাড়তি চাপ
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে উল্লেখযোগ্য নৌ ও বিমান শক্তির প্রয়োজন হতে পারে এবং এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সম্পদ অন্য কাজে সরিয়ে নিতে হতে পারে। কারণ গত এক বছরে হুথিদের অবস্থানের পরিবর্তন ঘটেছে, যা সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করা জরুরি।

যদি মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ ও বিমানগুলোকে হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদ ও আকাশ-প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টরের (ক্ষেপণাস্ত্র-বিধ্বংসী অস্ত্র) যে মজুদ কমে এসেছে, তা আরো সংকটাপন্ন হয়ে পড়তে পারে।

প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ বা সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপের বিষয়ে উদ্বেগের কথা অস্বীকার করেছেন। ওই কর্মকর্তা বলেন, “সর্বাধিনায়কের (প্রেসিডেন্টের) সব কৌশলগত লক্ষ্য পূরণ এবং তার বাইরেও প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চালানোর মতো পর্যাপ্ত গোলাবারুদ ও সামরিক সরঞ্জাম যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর হাতে রয়েছে।”

ইয়েমেনে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক বিশেষ দূত টিম লেন্ডারকিং বলেন, ট্রাম্প যেহেতু হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছেন, তাই সৌদি আরবের বিমান অভিযানের জন্য গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রতি কূটনৈতিক ও বস্তুগত সহায়তা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে আরো সক্রিয় হতে হবে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউ-এর আয়োজনে এক ওয়েবকাস্টে লেন্ডারকিং বলেন, “এই প্রশাসন ক্ষমতায় আসার সময় প্রশ্ন তুলেছিল—‘ইয়েমেন আমাদের জন্য কী করতে পারে?’ অথচ বাস্তবতা হলো, ইয়েমেন আমাদের দিনটি মাটি করে দিতে পারে (অর্থাৎ বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে)।”

(ওএস/এএস/সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬)