ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত

দেখা হলো না, আখতার ভাই

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৪ ১৮:১৭:৪৯
দেখা হলো না, আখতার ভাই

আবদুল হামিদ মাহবুব


আখতার হুসেনের সঙ্গে আমার কখনো দেখা হয়নি। একবার মাত্র ফোনে কথা হয়েছিল। সময়ের হিসাবে সেই কথোপকথন খুব দীর্ঘ ছিল না; মোটামুটি পনেরো থেকে বিশ মিনিট। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, সেই সামান্য সময়ের কথাগুলোই আজ কত দীর্ঘ হয়ে আমার কাছে ফিরে আসছে। মনে হচ্ছে, ফোনের ওপাশে বসে থাকা মানুষটির সঙ্গে সেদিন যেন শুধু কথা হয়নি, পরিচয়ের একটি দরজা খুলেছিল। সেই দরজা দিয়ে ঢুকে পড়েছিল তাঁর শৈশব, তাঁর লেখালেখি, তাঁর কর্মজীবনের টানাপোড়েন, আমাদের জেলার সঙ্গে তাঁর স্মৃতির সম্পর্ক এবং সর্বোপরি, একদিন দেখা হবে; এই ছোট্ট অথচ মধুর প্রত্যাশা। আজ সেই প্রত্যাশাটুকুও আর পূরণ হওয়ার নয়।

আখতার ভাই-ই আমাকে ফোন করেছিলেন। খুব বেশি আনুষ্ঠানিকতা ছিল না কথায়। কেমন আছি, কী করি, লেখালেখি করি কি না; এইসব ভালো-মন্দের কথাবার্তা। তিনি জানতেন, আমিও ছড়া লিখি। বলেছিলেন, সামনে আমার কোনো ছড়া পড়লে তিনি পড়েন। আমার ফোন নম্বরটি তিনি দীপংকর মোহান্তের কাছ থেকে পেয়েছেন, সেটিও জানিয়েছিলেন।

দীপংকর আমার খুব প্রিয় একজন মানুষ। বর্তমানে তিনি সুনামগঞ্জ প্রাইমারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের সুপারিনটেনডেন্ট। একসময় তাঁর সঙ্গে প্রায় প্রতিদিনই দেখা হতো। আমাদের শহরের কলেজের ছাত্র ছিলেন তিনি। পরে গবেষণায় নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন। তাঁর অনেকগুলো গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর প্রথম বইটি ছিল লীলা নাগকে নিয়ে। তারপর একে একে আরও কত বই যে বেরিয়েছে! দীপংকরের বই প্রকাশিত হলেই সে আমাকে একটি কপি উপহার দিত। সেই উপহার পাওয়ার আনন্দ আজও আমার কাছে অমলিন।

দীপংকরের সঙ্গে আখতার হুসেনের পরিচয়ের কথাটিও আমি তাঁর কাছ থেকেই জেনেছিলাম। মফিদুল হকের 'সাহিত্য প্রকাশ'- এ তাঁদের দেখা হয়েছিল। সাহিত্য প্রকাশ থেকে দীপংকরের অনেকগুলো বই বেরিয়েছে। সেই সূত্রে সাহিত্য প্রকাশে তাঁর নিয়মিত আসা-যাওয়া ছিল। আর আখতার ভাই সেখানে প্রুফরিডারের কাজ করতেন। পরে তিনি আমাকে বলেছিলেন, এখন তিনি 'প্রথমা'য় বই সম্পাদনা ও প্রুফরিডিং দুটো কাজই করেন। দীপংকরের কাছ থেকেই আখতার ভাই জেনেছিলেন, আমি সাহিত্যচর্চা করি এবং ছোটদের জন্য লেখালেখি করি। আমি একজন শিশুসাহিত্যিক; এই পরিচয়টিই যেন তাঁর কাছে একটু বিস্ময়ের ছিল। কারণ তিনিও শিশু সাহিত্যিক। এত কাছাকাছি সময়ে, একই সাহিত্যভুবনে বিচরণ করেও আমাদের দেখা হয়নি, এটাই তাঁর একরকম অভিযোগ ছিল। কথার ফাঁকে তিনি বলেছিলেন, “আপনি ছোটদের জন্য লেখেন, অথচ আপনার সঙ্গে আমার কখনো দেখা হলো না!” তাঁর কণ্ঠে অভিযোগের চেয়ে আন্তরিকতার সুরই বেশি ছিল।

আলাপের একসময় তিনি তাঁর শৈশবের কথা বলতে শুরু করলেন। জানালেন, আমাদের জেলার কুলাউড়া রেলস্টেশনের কাছে তাঁর বাল্যকাল কেটেছে। তাঁর বাবা রেলওয়েতে চাকরি করতেন। পোস্টিং ছিল কুলাউড়া রেল জংশনে। সেই সুবাদে তাঁর ছোটবেলার অনেকটা সময় কেটেছে কুলাউড়ায়। কথার মধ্যে তিনি কুলাউড়ার অনেক মানুষের নাম বললেন। তাঁদের কাউকেই আমি চিনতাম না। শুধু লেখালেখি করেন; এমন একজনের নাম শুনে চিনতে পেরেছিলাম, গোলাম কবির। তিনি এখন প্রবাসে।

কথা বলতে বলতে আখতার ভাই যেন নিজের শৈশবের দিনগুলোতে ফিরে গিয়েছিলেন। রেললাইনের পাশে কেটে যাওয়া সেই দিনগুলো, পরিচিত মুখ, স্টেশনের পরিবেশ; সবকিছু যেন তাঁর স্মৃতিতে তখনও জীবন্ত। তাঁর কথায় আমি সেই অচেনা শৈশবের একটা আবছা ছবি দেখতে পাচ্ছিলাম। আমি তাঁকে বলেছিলাম, একবার কুলাউড়ায় এসে ছোটবেলার জায়গাগুলো ঘুরে যেতে। পুরোনো মানুষদের খুঁজে দেখা, পরিচিত রাস্তায় দাঁড়ানো, স্টেশনের বাতাসে কিছুক্ষণ পুরোনো দিনকে ফিরে পাওয়া, এসব নিশ্চয়ই তাঁর ভালো লাগবে।

তিনি তখন বলেছিলেন, বয়স হয়েছে। চাইলেই এখন আর হুট করে কোথাও চলে যাওয়া যায় না। কথার ভেতর দিয়ে তাঁর সাংসারিক কিছু যন্ত্রণার কথাও উঠে এসেছিল। বলেছিলেন, এই বয়সেও তাঁকে কর্মকরে খেতে হচ্ছে। কথাটি আমার বুকের মধ্যে কেমন যেন বিঁধে গিয়েছিল। একজন লেখক, একজন সাহিত্যকর্মী, এতদিন কাজ করার পরও জীবনের এই সময়ে এসে তাঁকে কাজের অনিশ্চয়তার কথা বলতে হচ্ছে; বিষয়টি আমাকে ভেতর থেকে স্পর্শ করেছিল।

তিনি আমাকে বলেছিলেন, ঢাকা গেলে যেন তাঁর সঙ্গে দেখা করে আসি। আমিও বলেছিলাম, নিশ্চয়ই দেখা করব। কিন্তু মানুষ ভাবে একরকম, সময় তাকে নিয়ে যায় অন্যদিকে। এরপর আমি অনেকবার ঢাকায় এসেছি। কতবার যে ঢাকার রাস্তায় হেঁটেছি, কত কাজ করেছি, কত মানুষের সঙ্গে দেখা করেছি; কিন্তু আখতার ভাইয়ের কথা আর মনে পড়েনি। আজ ভাবছি, মানুষ কত সহজেই একটি প্রতিশ্রুতি নিজের অজান্তে ফেলে রাখে! অথচ অন্য একজন হয়তো সেই কথাটিকে মনে রেখেই বসে থাকেন।

সেদিন ফোনে তিনি জানতে চেয়েছিলেন, আমি তাঁর বই পড়ি কি না। আশ্চর্য কাকতাল; তখনই আমার হাতের কাছে ছিল তাঁর ‘প্রজাপতি ও প্রজাপতি’ বইটি। আমি হাত বাড়িয়ে বইটি হাতে নিয়ে তাঁকে বলেছিলাম, “এই মুহূর্তে আপনার একটি বই আমার হাতেই আছে।” তিনি বইটির নাম জানতে চাইলেন। বললাম, “ছড়ার বই ‘প্রজাপতি ও প্রজাপতি’।”

তিনি আমাকে সঙ্গে সঙ্গে সংশোধন করে দিলেন। বললেন, ওটা ছড়ার বই নয়, কিশোর কবিতার বই। বেশিরভাগ কবিতা স্বরবৃত্তে নয়, মাত্রাবৃত্তে লেখা। কোথাও স্বল্প মিল, কোথাও দীর্ঘ মিল আছে। তাই ওগুলোকে ঠিক ছড়া বলা যাবে না। তাঁর কথায় আমি একটু লজ্জাই পেয়েছিলাম। সত্যিই তো; বইটির লেখাগুলো একটু মন দিয়ে পড়লেই বোঝা যায়, সেগুলো বর্ণনাধর্মী কবিতা; প্রতিটি কবিতার গঠনও ছড়ার মতো সংক্ষিপ্ত নয়, বরং অনেকটাই দীর্ঘ। একজন লেখক নিজের লেখার প্রকৃতি সম্পর্কে কতটা সচেতন থাকেন, সেদিন তাঁর কথায় সেটি টের পেয়েছিলাম।

আমি বইটি খুলে তাঁকে সেখান থেকে তাঁরই একটি কবিতা পড়ে শুনিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, তিনি খুশি হয়েছেন। একজন লেখকের নিজের লেখা অন্য একজনের কণ্ঠে শুনতে পাওয়ার আনন্দ নিশ্চয়ই আলাদা। হয়তো ফোনের ওপাশে বসে তিনি মৃদু হেসেছিলেন। সেই হাসি আমি দেখতে পাইনি, কিন্তু তাঁর কণ্ঠে তার আভাস পেয়েছিলাম।

এরপর তিনি জানতে চাইলেন, আমি শিশুদের অনুষ্ঠানাদিতে যাই কি না। আমি বলেছিলাম, “একসময় তো আমরাও বাচ্চা ছিলাম। আমি ‘চাঁদের হাট’ করতাম।” তিনি তখন বললেন, “আমি খেলাঘর কেন্দ্রীয় কমিটিতে ছিলাম।” কথার পর কথায় যেন আমাদের দুজনের শৈশব ও শিশুসাহিত্যের জগৎ এক জায়গায় এসে মিলেছিল।

তিনি আরও জানতে চেয়েছিলেন, বাচ্চারা তাঁর ছড়া-কবিতা পড়ে কি না। আমি তাঁকে বলেছিলাম, মাঝেমধ্যে শিশুদের কবিতা আবৃত্তির প্রতিযোগিতায় আমাকে বিচারকের আসনে বসতে হয়। তখন অনেক শিশুর মুখেই তাঁর ছড়া-কবিতা আবৃত্তি শুনি। কথাটি শুনে তিনি নিশ্চয়ই আনন্দ পেয়েছিলেন। একজন লেখকের কাছে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে? তার লেখা শিশুর কণ্ঠে বেঁচে আছে। এটাতেই তৃপ্তি।

কথা শেষ করার আগে তিনি আবারও বলেছিলেন, ঢাকায় গেলে যেন 'প্রথমা'য় গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করি। তখন 'প্রথমা'র মালিক মতিউর রহমান, আমাদের 'মতি ভাই' সম্পর্কে আমি কিছু নেতিবাচক কথাও বলেছিলাম। মতি ভাইকে আমি চিনি ১৯৮০-৮১ সাল থেকে, যখন তিনি সাপ্তাহিক একতার সম্পাদক ছিলেন। আমি বলেছিলাম, পিঠ চাপড়ে মতি ভাই অনেক কাজ আদায় করে নিতে পারেন। তবে ঠিকঠাক টাকা-পয়সা দেন কি না, সেটি জানতে চেয়েছিলাম। আখতার ভাই তখন একেবারে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলেছিলেন, “আমাদের মতো লোককে কে কাজ দেবে? তারপরও তো কাজ পেয়েছি। ঠেলে ঠেলে তো দিন চলে যাচ্ছে।” তারপরই বলেছিলেন, সব কথা এভাবে ফোনে বলা সম্ভব নয়। দেখা হলে বলবেন। আমি আবারও বলেছিলাম, ঢাকা গেলে দেখা করব। কিন্তু সেই দেখা আর হলো না।

আজ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬। আকস্মিকভাবে ঢাকায় অবস্থান করছি। স্ত্রীর যে বিভাগে চাকরি, সেই বিভাগের অধিদপ্তর থেকে গতকাল সকালে হঠাৎ চিঠি এসেছিল। তাঁকে নিয়ে রাতেই ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিতে হয়েছে। অধিদপ্তরের কাজ সেরে একটু আগে ফিরেছি। তারপর ফেসবুক স্ক্রল করতে গিয়ে চোখে পড়ল লেখক ইমরান পরশের একটি পোস্ট; আখতার হুসেন আর নেই। ইন্তেকাল করেছেন।

খবরটি পড়ে বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন শূন্য হয়ে গেল। এতদিন যে মানুষটির সঙ্গে দেখা করার একটি ছোট্ট ইচ্ছা ছিল, সেই মানুষটিই আর নেই। অথচ আজ আমি ঢাকায়। আজ যদি তাঁর কথা মনে পড়ত! আজ যদি 'প্রথমা'তে যাওয়ার সুযোগ হতো! আজ যদি ফোনের ওপাশের সেই কণ্ঠটি আর একবার শুনতে পেতাম!

আখতার ভাই, আপনাকে আমি দেখিনি। আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল মাত্র একবারের ফোনালাপে। তবু সেই সামান্য কথাগুলো আজ এত আপন হয়ে উঠেছে যে, আপনার চলে যাওয়ার খবর শুনে মনে হচ্ছে, বহুদিনের পরিচিত একজন মানুষকে হারালাম। আপনি কুলাউড়ার যে শৈশবের কথা বলেছিলেন, যে মানুষের নামগুলো বলেছিলেন, যে কষ্টের কথা সামান্য আভাসে জানিয়েছিলেন, যে বই হাতে নিয়ে আমাকে ছড়া আর কিশোর কবিতার পার্থক্য বুঝিয়েছিলেন; সবকিছু আজ একসঙ্গে মনে পড়ছে।

ক্ষমা করবেন, আখতার ভাই। আপনি বলেছিলেন, ঢাকা গেলে যেন আপনার সঙ্গে দেখা করি। আমি এসেছি বহুবার, কিন্তু আপনার কাছে আর যাওয়া হয়নি। আজ যখন ঢাকায় এসে আপনার সঙ্গে দেখা করার মতো সব সুযোগই যেন সামনে ছিল, তখনই জানতে হলো; আপনি আর নেই। কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপগুলো খুব ছোট একটি অসম্পূর্ণ বাক্যের মতো থেকে যায়। আমার আক্ষেপটিও তেমন; “ঢাকা গেলে আখতার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করব।” সেই দেখা আর হলো না।

আপনি চলে গেলেন। থেকে গেল আপনার লেখা, আপনার কণ্ঠের স্মৃতি, কুলাউড়ার রেলজংশনের সেই শৈশবের গল্প, আর একজন অচেনা অথচ আপন হয়ে ওঠা মানুষের সঙ্গে পনেরো-বিশ মিনিটের একটি ফোনালাপ। আর আমার মনে থেকে গেল একটাই কথা; আখতার ভাই, দেখা হলো না। আর কোনোদিনই হবে না।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক।