ঢাকা, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত

শেখ হাসিনা ইস্যুতে ঢাকা–দিল্লি–ওয়াশিংটন: ডটগুলো কি একই ছবির?

২০২৬ সেপ্টেম্বর ৩০ ১৭:৫৯:৩৬
শেখ হাসিনা ইস্যুতে ঢাকা–দিল্লি–ওয়াশিংটন: ডটগুলো কি একই ছবির?

রাসেল আহমদ


২৮ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনার ৭৯তম জন্মদিন। এর মাত্র কয়েক দিন আগে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের কথিত আকস্মিক ঢাকা সফর। এরপর নিউইয়র্কে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক উপ-সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিথানি মরিসনের বিশেষ ব্রিফিং। দৃশ্যত তিনটি আলাদা ঘটনা। কিন্তু সেপ্টেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের ডটগুলো পাশাপাশি রাখলে প্রশ্ন উঠতেই পারে- এগুলো কি কোনো বৃহত্তর কূটনৈতিক সমীকরণের অংশ?

আমার পাঠে, হ্যাঁ- একটি বার্তা আছে। তবে সেটি কোনো গোপন চুক্তির নিশ্চিত প্রমাণ নয়; বরং ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসের একটি সম্ভাব্য কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার সংকেত।

১৭ সেপ্টেম্বর অজিত দোভাল ঢাকায় এসেছিলেন- এমন খবর ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সফরটি ছিল সংক্ষিপ্ত এবং এর বিষয়ে বাংলাদেশ বা ভারত কোনো আনুষ্ঠানিক বিবরণ দেয়নি। 'টাইমস অব ইন্ডিয়া’ জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য নভেম্বরের ভারত সফরের পথ প্রস্তুত করাই ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে সফর আয়োজনের বিষয়ে দুই দেশ কাজ করছে এবং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি সফরটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অমীমাংসিত বিষয়।

এখানে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সংকেতটি হলো- ঢাকা ও দিল্লি মুখোমুখি অবস্থান থেকে বেরিয়ে আবার উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগের দিকে এগোচ্ছে। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, তারেক রহমানকে এর আগে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ সম্ভাব্য নভেম্বর সফরটি হঠাৎ তৈরি হওয়া কোনো উদ্যোগ নয়; এর পেছনে আগের কূটনৈতিক যোগাযোগও রয়েছে।
কিন্তু সেই সম্পর্কের মাঝখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শেখ হাসিনা।

বাংলাদেশ তাঁকে ফেরত চায়। ভারত বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ নিয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় বিষয়টি পরীক্ষা করছে বলে জানিয়েছে। ফলে এটিকে সরল ‘ভারত প্রত্যর্পণ করবে কি করবে না’ প্রশ্নে নামিয়ে আনা ঠিক হবে না। এর সঙ্গে প্রত্যর্পণ চুক্তি, ভারতের নিজস্ব আইনি প্রক্রিয়া, বাংলাদেশের বিচারিক সিদ্ধান্ত এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক- সবকিছুই জড়িত।

শেখ হাসিনা নিজেও ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় এবং ভারতে তাঁর অবস্থান- দুটিই সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনকে অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তুলেছে।

এই জায়গায় দোভালের কথিত ঢাকা সফরের তাৎপর্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তিনি কি শুধু তারেক রহমানের ভারত সফরের প্রটোকল ও রাজনৈতিক প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিলেন? নাকি শেখ হাসিনাকে ঘিরে দুই দেশের অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোর সম্ভাব্য সমাধানের ক্ষেত্রও তৈরি করতে চেয়েছেন?

দ্বিতীয় প্রশ্নটির উত্তর এখনো প্রকাশ্যে প্রমাণিত নয়। কিন্তু একজন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সফরকে শুধু আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সৌজন্য হিসেবে দেখারও কারণ নেই। জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংবেদনশীল বিষয়ে এ ধরনের যোগাযোগ সাধারণত প্রকাশ্য বিবৃতির চেয়ে নেপথ্যের আলোচনাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। তাই দোভালের সফরকে সম্ভাব্য কূটনৈতিক গ্রাউন্ডওয়ার্কের সংকেত হিসেবে পড়া যায়; তবে তাঁর নির্দিষ্ট এজেন্ডা সম্পর্কে চূড়ান্ত দাবি করা যায় না।

এরপর আসে ওয়াশিংটন। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে নিউইয়র্ক ফরেন প্রেস সেন্টারে দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ে এক ব্রিফিংয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তা বলেন, শেখ হাসিনা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র এখনো কোনো নির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিক অবস্থান নেয়নি। তিনি বলেন, বিষয়টি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বড় ধরনের উত্তেজনার কারণ এবং ওয়াশিংটন আশা করে দুই দেশ নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে একটি সমাধানে পৌঁছাবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে শেখ হাসিনার বিষয়ে এগোতে হবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশও দেয়নি।

এই বক্তব্যকে দুই পক্ষ দুইভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে। ঢাকার কেউ বলতে পারেন- ওয়াশিংটন শেখ হাসিনার পক্ষে দাঁড়ায়নি। আবার আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা বলতে পারেন- যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি ভারত ও বাংলাদেশের ওপর ছেড়ে দিয়েছে, অর্থাৎ ভারতের অবস্থানের প্রতি তাদের আপত্তি নেই।

কিন্তু কূটনীতির ভাষা একটু অন্যভাবে পড়তে হয়। ওয়াশিংটন যা বলেছে, তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো- ‘আমরা নির্দিষ্ট অবস্থান নিইনি’ এবং ‘বাংলাদেশ ও ভারত নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সমাধান করুক।’ এর অর্থ ভারতের যে কোনো সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্র আগাম সম্মতি দিয়েছে- এমন নয়। বরং এর অর্থ হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র এই প্রশ্নটিকে আপাতত ঢাকা–দিল্লির দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পরিসরেই রাখতে চাইছে।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, একই ব্রিফিংয়ে ওয়াশিংটন বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছে এবং বাংলাদেশকে তার সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা সুসংহত করতে সহযোগিতার কথা জানিয়েছে। তিন বৃহৎ শক্তি- যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীন- এর সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে মার্কিন অবস্থানও ছিল পরিষ্কার: বাংলাদেশকে কোনো পক্ষ বেছে নিতে চাপ দিতে চায় না; বরং যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে একটি বিকল্প অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়।

এখানেই পুরো সমীকরণের গভীরতা

বাংলাদেশের জন্য ভারত অপরিহার্য প্রতিবেশী। সীমান্ত, বাণিজ্য, পানি, জ্বালানি, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার কারণে দিল্লির সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক প্রয়োজন। আবার বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রও গুরুত্বপূর্ণ- বাণিজ্য, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির কারণে। চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কও বাস্তবতা। ফলে ঢাকার কৌশলগত প্রয়োজন এখন কোনো একটি শক্তির ছায়ায় থাকা নয়; বরং নিজের স্বার্থকে সামনে রেখে একাধিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক পরিচালনা করা।

ভারতের ক্ষেত্রেও হিসাবটি সরল নয়। দিল্লি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চাইবে- কিন্তু একই সঙ্গে শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ, তাঁর নিরাপত্তা এবং প্রত্যর্পণ প্রশ্নে নিজের অবস্থানও বিবেচনা করবে। ফলে তারেক রহমানের সম্ভাব্য নয়াদিল্লি সফর শুধু একটি সৌজন্য সফর হওয়ার কথা নয়; এটি দুই দেশের নতুন সম্পর্কের কাঠামো নিয়ে রাজনৈতিক পরীক্ষা হতে পারে।

এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্কেও ২০২৬ সালে টানাপোড়েন ও দর-কষাকষি চলছে। ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশ একটি অন্তর্বর্তী বাণিজ্য কাঠামোয় পৌঁছালেও সেপ্টেম্বরের শেষেও বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত ছিল। ভারতীয় বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে আলোচনায় বসছেন।
তবে এখান থেকে শেখ হাসিনা ইস্যুতে ভারতের প্রতি ওয়াশিংটনের অবস্থানকে সরাসরি বাণিজ্য-দরকষাকষির ফল বলা যাবে না।

ভূ-রাজনীতিতে কারণ-ফলাফল এত সরল নয়। বরং বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করলেও বাংলাদেশকেও একটি স্বাধীন ও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখতে চাইছে। সেই বাস্তবতায় শেখ হাসিনা প্রশ্নে সরাসরি পক্ষ নেওয়ার পরিবর্তে দ্বিপক্ষীয় সমাধানের কথা বলাই ওয়াশিংটনের জন্য কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক।

তাহলে ডটগুলো মিলিয়ে কী দেখা যায়?

দেখা যায়, ঢাকা ও দিল্লি সম্পর্ককে নতুন করে সাজানোর চেষ্টা করছে। শেখ হাসিনা সেই পুনর্বিন্যাসের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলোর একটি। অজিত দোভালের কথিত ঢাকা সফর সম্ভাব্য উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের একটি সংকেত। তারেক রহমানের সম্ভাব্য নভেম্বর সফর সেই যোগাযোগকে রাজনৈতিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। আর ওয়াশিংটন আপাতত এই প্রশ্নে সরাসরি ফল নির্ধারণ না করে ঢাকা ও দিল্লির আলোচনার ওপর জোর দিচ্ছে।

এখনই বলা যাবে না যে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে কোনো গোপন সমঝোতা হয়ে গেছে। আরও বলা যাবে না যে তিনি নিশ্চিতভাবেই ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরবেন কিংবা ২০২৭ সালের জন্মদিন বাংলাদেশে পালন করবেন। এসব এখনো অনুমান। কিন্তু এটুকু বলা যায়- শেখ হাসিনা ইস্যু আর কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক পুনর্গঠন, বাংলাদেশের বিচারিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র–ভারত–বাংলাদেশের কৌশলগত সম্পর্কের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছে।

সম্ভাব্য তারেক রহমান–নরেন্দ্র মোদি বৈঠক তাই শুধু একটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হবে না। সেখানে প্রশ্ন উঠবে- কীভাবে পুরোনো বিরোধ পেরিয়ে নতুন সম্পর্ক তৈরি করা যায়, এবং সেই সম্পর্কের ভিত কতটা হবে পারস্পরিক স্বার্থ, সার্বভৌম সিদ্ধান্ত ও আস্থার ওপর।

সেপ্টেম্বরের ঘটনাগুলোর সবচেয়ে বড় বার্তা সম্ভবত সেখানেই: ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কের পরবর্তী অধ্যায় শুধু দিল্লি বা ঢাকা একা লিখবে না; এর প্রতিটি বাক্য পড়বে ওয়াশিংটন, বেইজিংসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়া। আর শেখ হাসিনা ইস্যু সেই নতুন অধ্যায়ের সবচেয়ে কঠিন বাক্যগুলোর একটি।

লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও কলাম লেখক।