প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত
মোস্তফা ভাই: এক বীর মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিতে
২০২৬ অক্টোবর ০৫ ১৭:৪৭:৫৩
আবদুল হামিদ মাহবুব
মোহাম্মদ মোস্তফাকে তখন চিনতাম না। আমরা তখন কিশোর। সেই সময়ই আমি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। পাশাপাশি শিশু-কিশোর সংগঠন ‘চাঁদের হাট’-এর সঙ্গেও কাজ করতাম। তখন আমাদের শহরে ‘খেলাঘর’, ‘কচিকাঁচার মেলা’সহ বিভিন্ন শিশু-কিশোর সংগঠন বেশ সক্রিয় ছিল। কেন্দ্রভিত্তিক এসব সংগঠনের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে একসময় একটি সংগঠনের জন্ম হলো; ‘সবুজ সেনা’।
একবার আমরা সব শিশু-কিশোর সংগঠন মিলে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করলাম। উদ্দেশ্য ছিল, মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে সরাসরি তাঁদের বীরত্বের গল্প শুনব। ঘটনাটি সম্ভবত আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ের। তখনই দেখা দিল সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধা খুঁজে পাওয়ার প্রশ্ন; যিনি সরাসরি রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছেন।
আমি মুজিবুর রহমান মুজিবকে চিনতাম। কিন্তু তিনি সরাসরি রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেননি। সাংবাদিক শফকতুল ওয়াহেদকে চিনতাম। তিনি আমার আত্মীয়ও। তিনিও একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমরা দলবেঁধে তাঁর কাছে গেলাম। অনুরোধ করলাম, তিনি যেন অনুষ্ঠানে এসে শিশু-কিশোরদের মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনান। কিন্তু তিনি রাজি হলেন না। বললেন, তিনি গুছিয়ে গল্প বলতে পারেন না। আর তিনি সরাসরি রণাঙ্গনে যুদ্ধও করেননি। শফকতুল ওয়াহেদ ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক। তৎকালীন প্রবাসী সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত হিসেবে ভারতে কয়েকটি শরণার্থী ক্যাম্পের রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
সেই শফকতুল ওয়াহেদই আমাদের সন্ধান দিলেন মোহাম্মদ মোস্তফার। তিনি বললেন, “এই মুক্তিযোদ্ধা সরাসরি রণাঙ্গনে কয়েকটি অপারেশনে যুক্ত ছিলেন। তোমরা তাঁকে নিলে তিনি তাঁর অভিজ্ঞতার কথা খুব সুন্দরভাবে বলতে পারবেন।” মোহাম্মদ মোস্তফা তখন মৌলভীবাজার শহরের শাহ মোস্তফা রোডে শিশু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিপরীতে একটি বাসায় ভাড়া থাকতেন। আমরা তাঁর কাছে গেলাম। আমাদের আয়োজনের কথা বিস্তারিত বললাম। তিনি রাজি হয়ে গেলেন।
নির্দিষ্ট দিনে তিনি আমাদের অনুষ্ঠানে এলেন। শিশু-কিশোরদের সামনে তুলে ধরলেন তাঁর মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও রণাঙ্গনের বীরত্বের কথা। মন্ত্রমুগ্ধের মতো পুরো হলজুড়ে বসে থাকা শিশুরা তাঁর গল্প শুনেছিল। সেই থেকে মোহাম্মদ মোস্তফাকে চিনি।
পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধ গবেষক তাজুল মোহাম্মদ মৌলভীবাজারে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধকথা সংগ্রহ ও লিপিবদ্ধ করার কাজ করছিলেন। তখন আমিই তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলাম মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ মোস্তফার কাছে। তাজুল মোহাম্মদের ‘যুদ্ধকথা’ বইয়ে মোহাম্মদ মোস্তফার সেই বীরত্বের কাহিনী লিপিবদ্ধ হয়েছে। বইটিতে তাঁর ছবিও রয়েছে।
এরপর মোস্তফা ভাইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। আমি তাঁকে ‘মোস্তফা ভাই’ বলেই ডাকতাম। আমাদের সাংবাদিক মহলেও তাঁর একটি পরিচিতি তৈরি হয়েছিল।একসময় তিনিও সাংবাদিকতা শুরু করলেন। খুব ভালো ইংরেজি জানতেন। একটি ইংরেজি পত্রিকায় নিয়মিত খবর পাঠাতে শুরু করলেন এবং একপর্যায়ে সেখানে নিয়োগও পেলেন। মৌলভীবাজার প্রেসক্লাবের সদস্য হলেন। পরবর্তীতে প্রেসক্লাবের আজীবন সদস্যও হয়েছিলেন।
দীর্ঘ সময়ের সম্পর্কের সব কথা ছোট্ট পরিসরে বলা সম্ভব নয়। মোস্তফা ভাইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্কের অনেক অধ্যায়ই আজ স্মৃতির পাতায় রয়ে গেল। জীবনের একপর্যায়ে তিনি কয়েকবার যুক্তরাজ্যে গিয়েছিলেন। তাঁর স্ত্রী দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। সপ্তাহে তিন দিন তাঁকে সিলেটে নিয়ে ডায়ালাইসিস করাতে হতো। চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে মোস্তফা ভাই ধারদেনায় জড়িয়ে পড়েছিলেন। তাঁদের একমাত্র ছেলে যুক্তরাজ্যে লেখাপড়া শেষ করে ভালো চাকরি করছিলেন। এখনো সেখানে চাকরি করছেন, সংসারও করছেন।
সর্বশেষ মোস্তফা ভাই তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার পর ভাবী সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। ছেলে তাঁর মায়ের মরদেহ দেশে এনে দাফন করেন। কিন্তু মোস্তফা ভাই আর দেশে ফেরেননি। তিনি যুক্তরাজ্যেই থেকে যাওয়ার চেষ্টা শুরু করেন।
একদিন আমাকে ফোন করে জানালেন, তিনি যে মৌলভীবাজার প্রেসক্লাবের সদস্য; এ-সংক্রান্ত কিছু কাগজপত্র তৈরি করে দিলে তাঁর সেখানে থাকার প্রক্রিয়া সহজ হবে। তখন প্রেসক্লাবের সম্পাদক ছিলেন এস এম উমেদ আলী। তাঁকে আমি মোস্তফা ভাইয়ের বিষয়টি খুলে বললাম।উমেদ ভাই বললেন, “মোস্তফা ভাইকে বলুন, কী লিখতে হবে তার একটি ড্রাফট যেন পাঠিয়ে দেন।”
আমি কথাটি মোস্তফা ভাইকে জানালাম। তিনি প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে কী কী লেখা প্রয়োজন, তার পুরো ড্রাফট পাঠিয়ে দিলেন। উমেদ ভাই তাঁর কম্পিউটারে প্রেসক্লাবের প্যাডে সেগুলো প্রিন্ট করে স্বাক্ষর করে আমার হাতে দিলেন। আমি সেসব কাগজ মোস্তফা ভাইয়ের কাছে পাঠিয়ে দিলাম। একসময় জানতে পারলাম, মোস্তফা ভাই যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়ের সিদ্ধান্ত পেয়েছেন। সর্বশেষ যতদূর জেনেছিলাম, তিনি সেই দেশের নাগরিকত্বও পেয়েছিলেন।
আজ (৪ অক্টোবর'২০২৬) খবর পেলাম; আমাদের সেই মোহাম্মদ মোস্তফা আর নেই। যুক্তরাজ্যের একটি নার্সিংহোমে তিনি ইন্তেকাল করেছেন। তার বড় দেহ দেশে আসবেনা। সে দেশেই তাকে সমাহিত করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
মোস্তফা ভাই, আপনার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি। এ দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে আপনার বীরত্ব ও অবদানের কথা বিভিন্ন বইয়ে লিপিবদ্ধ আছে। সেই বীরত্বের কথা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ুক। আপনার মতো সাহসী মানুষদের জীবন ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি নতুন প্রজন্মকে দেশ ও মানুষের জন্য দাঁড়াতে অনুপ্রেরণা দিক।
মোস্তফা ভাই, আপনাকে টুপিখোলা অভিবাদন।শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়; আপনার স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক।
