ঢাকা, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » দেশের খবর » বিস্তারিত

নড়াইলে ৫৪৩টি মন্ডবে দুর্গা পূজার প্রস্তুতি প্রায় শেষের পথে

২০২৬ অক্টোবর ০৫ ১৮:৪৯:১৮
নড়াইলে ৫৪৩টি মন্ডবে দুর্গা পূজার প্রস্তুতি প্রায় শেষের পথে

রূপক মুখার্জি, নড়াইল : নীল আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে সাদা মেঘ। শরতের শান্ত স্নিগ্ধ হাওয়ায় মাঠজুড়ে দোল খাচ্ছে ধানের চারা। নদীতীরের কাশফুল আর বাড়ির আঙিনায় ফুলের সুগন্ধি জানান দিচ্ছে দেবী দুর্গার আগমনী বার্তা।

দেবী দুর্গার আগমন ঘিরে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন নড়াইলের মৃৎশিল্পীরা। খড় ও মাটির কাজ শেষ করে এখন প্রতিমায় কেউ দিচ্ছেন রং-তুলির টান; কেউ বা মাটির প্রলেপ দিয়ে প্রতিমায় রং লাগানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

আজ সোমবার নড়াইল সদর উপজেলা, লোহাগড়ার কয়েকটি মন্দির ঘুরে দেখা গেছে,
দুর্গা পূজার আয়োজকদের ব্যস্ততার যেন শেষ নেই! পূজা উপলক্ষে গঠিত কমিটির নেতারা অর্থ সংগ্রহের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের নিমন্ত্রণপত্র বিলি করছে। মন্ডবের সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা, পূজার উপকরণ সংগ্রহসহ অন্যান্য কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন আয়োজকরা।

বসে নেই প্রতিমা শিল্পীরাও। দীর্ঘ দুই মাসের অধিক সময় ধরে এসব শিল্পীরা বিভিন্ন মন্ডবে প্রতিমার রং করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। কাদামাটির প্রলেপ দিয়ে প্রতিমাকে দৃষ্টিনন্দন করে তুলছেন। তবে অনেক মন্ডবে ইতোমধ্যে প্রতিমার রঙের কাজ শেষ হয়েছে। কোনো কোনো মণ্ডপে আবার প্রতিমার অবয়বে পড়ছে রং-তুলির টান। এরপর সাজসজ্জা আর অলংকারে পূর্ণতা পাবে দুর্গার প্রতিমা।
শিল্পীর হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে দুর্গা ছাড়াও অন্যান্য প্রতিমার অবয়ব।

নড়াইলে শুধু নড়াইলের শিল্পীরাই নন, দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে বিভিন্ন জেলা থেকেও মৃহৎশিল্পীরা এসেছেন এ জেলায় প্রতিমা তৈরির কাজে।

এদিকে সময় যত ঘনিয়ে আসছে, বাড়ছে শিল্পীদের ব্যস্ততাও। তবে ব্যস্ততা বাড়লেও আগের মতো লাভ হচ্ছে না বলে জানান প্রতিমাশিল্পীরা। মাটি, খড়, রং ও অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়েছে। সে অনুযায়ী বাড়েনি প্রতিমা গড়ার পারিশ্রমিক। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় ও পরিশ্রমের তুলানায় আয় কমেছে তাদের।

নড়াইল টাউন কালীবাড়ি দুর্গা মন্দিরে খুলনা থেকে এসেছেন প্রতিমাশিল্পী দেবদাস সরদার। ছোটবেলা থেকে কাদামাটি ও রং-তুলির সঙ্গে বেড়ে ওঠা তার। এ বছর নড়াইলের তিনটি মণ্ডপে প্রতিমা গড়ার কাজ করছেন তিনি। তবে তার প্রতিমা নিখুঁত ও নান্দনিক হওয়ায় পারিশ্রমিকও বেশি। তিনি জানান, প্রতিটি প্রতিমা আড়াই লাখ থেকে তিন লাখ টাকা চুক্তিতে নির্মাণ করছেন তিনি।

দেবদাসের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিমা গড়ার জন্য মাটি, খড়, রং এবং অন্যন্য উপকরণ, সহযোগীদের বেতন—সব মিলিয়ে তেমন লাভ থাকে না। লাভ না হওয়ায় অনেকেই এই পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বলে দাবি এ শিল্পীর।

নড়াইল সর্বজনীন মন্দিরে দুর্গা প্রতিমা নির্মাণ করছেন প্রতিমা শিল্পী উজ্জ্বল পাল। এ বছর পাঁচটি মণ্ডপে দুর্গা প্রতিমা নির্মাণ করছেন।

এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘অন্য বছরের তুলনায় এবছর প্রতিমার সাজসজ্জার সামগ্রীর দাম বেশি। এ ছাড়া কিছু কিছু রং রয়েছে যা এ দেশে পাওয়া যায় না। ভারত থেকে আনতে হয়। এ কারণে প্রতিমা তৈরির উপকারণ, শ্রমিকের মজুরি—সব মিলিয়ে তেমন লাভ হয় না।’

উজ্জ্বলের ভাষ্য, বংশ পরম্পরায় এ কাজ করে আসছি। শিল্পীরের ঐতিহ্য টিকেয়ে রাখতে এ পেশা ধরে রাখছি।’ তিনি বলেন, ‘একেকটি প্রতিমা তৈরি করতে ৩০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে।’ প্রতিমার আকার ও সৌন্দর্য অনুযায়ী এ দাম নেওয়া হয় বলে জানান তিনি।

আয়োজকরা জানান, অন্য বছরের তুলনায় এ বছর প্রতিমা নির্মাণের খরচ অনেক বেশি। ১০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে প্রতিমার সৌন্দর্য অনুযায়ী সাড়ে তিন লাখ টাকায় এসব প্রতিমা তৈরি করা হচ্ছে।

নড়াইল কেন্দ্রীয় টাউন কালীবাড়ি দুর্গামন্দিরের সাধারণ সম্পাদক অশোক কুমার কুণ্ডু বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এ মন্দিরে শারদীয় দুর্গোৎসব হয়ে আসছে। এ বছরও উৎসব সাড়ম্বর করার প্রস্তুতি চলছে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের গত বছরের চেয়ে এ বছর প্রতিমা শিল্পীদের পারিশ্রমিক দিতে হচ্ছে অনেক বেশি। আশা করছি শান্তি ও শৃঙ্খলার সঙ্গে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে।’

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য মতে, এ বছর নড়াইল জেলায় ৫৪৩টি মণ্ডপ ঘিরে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এগুলো হলো সদর উপজেলায় ২৪৯টি, কালিয়া উপজেলায় ১৪৪টি ও লোহাগড়া উপজেলায় ১৫০টি। জেলায় আগের বছরের তুলনায় এ বছর মণ্ডপ বেড়েছে ১৯টি।

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ সভাপতি অ্যাড. পংকজ বিহারী ঘোষ অন্ন বলেন, ‘আমরা পূজা উদযাপন পরিষদের পক্ষ থেকে দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন করতে চাই। এ জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। মন্দিরে মন্দিরে গিয়ে খোঁজখবর রাখছি। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পূজা হবে— এই ধারণা নিয়েই জেলায় মণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে।’

(আরএম/এসপি/অক্টোবর ০৫, ২০২৬)