প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত
ডাক বিভাগ: সম্পদ আছে, সক্ষমতা নেই
২০২৬ অক্টোবর ০৯ ১৮:৩৭:৪৬
মীর আব্দুর আলীম
বাংলাদেশ ডাক বিভাগ আজ এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সারা দেশে বিস্তৃত হাজার হাজার ডাকঘর, বিপুল জনবল, মূল্যবান জমি ও ভবন এবং দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটি প্রত্যাশিত সেবা দিতে পারছে না। কোথাও ডাকঘরের ভবন জরাজীর্ণ, কোথাও জনবলসংকট, কোথাও প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার, আবার কোথাও সেবার মান নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ। বিশ্ব ডাক দিবস উপলক্ষে সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ ও প্রতিবেদনেও এই সংকটের নানা দিক উঠে এসেছে। অথচ এই ডাক বিভাগই একসময় দেশের মানুষের যোগাযোগ, অর্থ লেনদেন এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সংযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, যে প্রতিষ্ঠানের রয়েছে এত বিস্তৃত অবকাঠামো ও বিপুল সম্পদ, তাকে কেন আজও লোকসান ও অব্যবস্থাপনার বোঝা বহন করতে হচ্ছে? কেন দেশের ক্রমবর্ধমান ই-কমার্স ও পার্সেল পরিবহনের বাজারে রাষ্ট্রের নিজস্ব প্রতিষ্ঠানটি শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারছে না?
লন্ডন থাকার সময় যুক্তরাজ্যের রয়্যাল মেইলকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। পাঁচ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে টিকে থাকা এই ডাকসেবা প্রতিষ্ঠান কীভাবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়ে আধুনিক লজিস্টিকস ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে, তা আমাকে গভীরভাবে ভাবিয়েছিল। ১৫১৬ সালে যার ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু, সেই রয়্যাল মেইল আজ প্রচলিত চিঠি পরিবহনের গণ্ডি পেরিয়ে পার্সেল, ই-কমার্স, আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে স্বাধীনতার পর ৫৫ বছর অতিক্রম করেও বাংলাদেশের ডাক বিভাগ তার বিপুল সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। দুটি প্রতিষ্ঠানের বাজার, মালিকানা ও ব্যবসায়িক পরিবেশ এক নয়; তাই তাদের সরাসরি তুলনা না করে বরং প্রশ্ন তোলা জরুরি, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের কার্যক্রম বদলানোর ক্ষেত্রে রয়্যাল মেইল যে অভিযোজন দেখিয়েছে, বাংলাদেশের ডাক বিভাগ তা দেখাতে পারেনি কেন?
বাংলাদেশ ডাক বিভাগের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বিস্তৃত ভৌগোলিক নেটওয়ার্ক। প্রচলিত হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৯ হাজার ৮৮৬টি ডাকঘর রয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে সরকারি জমি, ভবন, জনবল, পরিবহনব্যবস্থা এবং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা। সরকার যদি আজ নতুন করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছানোর মতো একটি জাতীয় লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে চায়, তাহলে জমি অধিগ্রহণ, ভবন নির্মাণ, জনবল নিয়োগ, যানবাহন, প্রযুক্তি ও পরিচালনব্যবস্থায় বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে। অথচ এই অবকাঠামোর বড় অংশ রাষ্ট্রের হাতে আগে থেকেই রয়েছে। এমন সম্পদ থাকা সত্ত্বেও তা যথাযথভাবে ব্যবহার করতে না পারা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা নয়, রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতারও অপচয়। ডাক বিভাগের সম্পদের প্রকৃত মূল্য, বর্তমান ব্যবহার, আয় সৃষ্টির সম্ভাবনা এবং আর্থিক অবস্থার ওপর একটি পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ নিরীক্ষা হওয়া জরুরি।
বাংলাদেশে বেসরকারি কুরিয়ার খাতের দ্রুত বিকাশ ঘটেছে। ই-কমার্স, অনলাইন কেনাকাটা এবং দ্রুত পণ্য সরবরাহের চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছে। প্রযুক্তি, গ্রাহকসেবা ও দ্রুত সরবরাহের মাধ্যমে তারা বাজারে অবস্থান শক্ত করেছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একই দেশে রাষ্ট্রের এত বিস্তৃত অবকাঠামো থাকার পরও ডাক বিভাগ কেন এই বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারল না? কেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারল, অথচ সরকারি প্রতিষ্ঠানটি পিছিয়ে পড়ল? এই পরিস্থিতির পেছনে নীতিগত ব্যর্থতা, প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের ঘাটতি, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা কিংবা দীর্ঘদিনের অবহেলা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। ডাক বিভাগের দুর্বলতা থেকে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল সুবিধা পেয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। তবে প্রমাণ ছাড়া কাউকে ষড়যন্ত্রের জন্য দায়ী না করে তথ্যভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করতে হবে এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
স্মার্টফোন, ই-মেইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে ব্যক্তিগত চিঠির ব্যবহার কমেছে। কিন্তু তাই বলে ডাক বিভাগের প্রয়োজন শেষ হয়ে গেছে, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। বরং ই-কমার্স, অনলাইন ব্যবসা, কৃষিপণ্য বিপণন এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পণ্য পরিবহনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দেশের অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী শাখা নেই, অথচ সেখানে ডাকঘর রয়েছে। এসব ডাকঘরকে পণ্য গ্রহণ, বিতরণ ও সরবরাহকেন্দ্রে পরিণত করা গেলে গ্রামের কৃষক, নারী উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হস্তশিল্প প্রস্তুতকারকেরা সহজেই দেশের বিভিন্ন স্থানে পণ্য পাঠাতে পারবেন। এতে গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ ঘটবে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বাজার সম্প্রসারিত হবে এবং ডাক বিভাগেরও নতুন আয়ের পথ তৈরি হবে। একইভাবে সরকারি মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, আদালত, শিক্ষা বোর্ড এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নথিপত্র পরিবহনে ডাক বিভাগকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। তবে এ জন্য নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ, নথির নিরাপত্তা, ব্যয়ের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রের নিজস্ব প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার অর্থ অদক্ষতাকে প্রশ্রয় দেওয়া নয়; বরং নির্দিষ্ট মান পূরণের মাধ্যমে তাকে প্রতিযোগিতার উপযোগী করে তোলা।
ডাক বিভাগের পুনর্জাগরণের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকায়ন অপরিহার্য। প্রতিটি পার্সেলের জন্য ডিজিটাল ট্র্যাকিং চালু করতে হবে, যাতে গ্রাহক মোবাইল ফোন থেকেই জানতে পারেন তাঁর পার্সেল কোথায় রয়েছে এবং কখন পৌঁছাবে। অনলাইন বুকিং, ডিজিটাল রসিদ, দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং কর্মীদের দক্ষতা মূল্যায়নের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি ডাকঘরের বিদ্যমান আর্থিক সেবাকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করে প্রান্তিক মানুষের জন্য আরও কার্যকর ডিজিটাল জনসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব। এ জন্য একটি বাস্তবসম্মত পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রথম বছরে ডাক বিভাগের জমি, ভবন, জনবল ও আর্থিক কার্যক্রমের নিরীক্ষা এবং ডিজিটাল আধুনিকায়ন শুরু করতে হবে। দ্বিতীয় বছরে নির্বাচিত এলাকায় আধুনিক পার্সেল ও সরকারি নথি পরিবহনব্যবস্থা চালু করে ফলাফল মূল্যায়ন করতে হবে। তৃতীয় বছরে সফল উদ্যোগগুলো সারা দেশে সম্প্রসারণ এবং পরবর্তী দুই বছরে ই-কমার্স, আর্থিক সেবা ও গ্রামীণ লজিস্টিকস কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করতে হবে। প্রতিটি পর্যায়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্য, সময়সীমা এবং কর্মদক্ষতার সূচক নির্ধারণ করা জরুরি। যেসব প্রত্যন্ত ডাকঘর সামাজিক দায়িত্ব পালনের কারণে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হতে পারবে না, সেগুলোর সেবাব্যয় আলাদাভাবে নিরূপণ করে স্বচ্ছ সরকারি সহায়তার ব্যবস্থা করা উচিত।
ডাক বিভাগের বর্তমান দুরবস্থার কারণ অনুসন্ধানে গত কয়েক দশকের নীতিগত সিদ্ধান্ত, আধুনিকায়ন প্রকল্প, অর্থ বরাদ্দ এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা দরকার। কোথায় অর্থের অপচয় হয়েছে, কোথায় পরিকল্পনার ঘাটতি ছিল এবং কেন প্রত্যাশিত ফলাফল আসেনি, তা জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। একই সঙ্গে দক্ষ নেতৃত্ব, পেশাদার ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং উদ্ভাবনী উদ্যোগের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। সরকার যদি ডাক বিভাগকে কেবল ঐতিহ্যবাহী একটি সরকারি দপ্তর হিসেবে বিবেচনা করে, তাহলে এর বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব হবে না। একে জাতীয় লজিস্টিকস, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং ডিজিটাল জনসেবার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে দেখতে হবে।
বাংলাদেশ ডাক বিভাগ কোনো অতীতের স্মৃতিচিহ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ। চিঠির বাজার সংকুচিত হলেও পণ্য পরিবহন ও ডিজিটাল সেবার বাজার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সেই সুযোগ কাজে লাগানোর মতো অবকাঠামো বাংলাদেশের রয়েছে। এখন প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, আধুনিক প্রযুক্তি, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। রয়্যাল মেইলের দীর্ঘ ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোনো প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখার জন্য শুধু ঐতিহ্য যথেষ্ট নয়; সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হওয়ার সক্ষমতাও থাকতে হয়। বাংলাদেশের ডাক বিভাগকেও সেই পরিবর্তনের পথে এগোতে হবে। কারণ ডাক বিভাগের পুনর্জাগরণ মানে শুধু একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের পুনরুত্থান নয়; এটি রাষ্ট্রের সম্পদ রক্ষা, গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ এবং জনগণের আস্থা পুনর্গঠনেরও প্রশ্ন।
লেখক: সাংবাদিক, সমাজ গবেষক, মহাসচিব-কলামিস্ট ফোরাম অব বাংলাদেশ।
