প্রচ্ছদ » পাঠকের লেখা » বিস্তারিত
সাংবাদিক হত্যা: আর কত লাশের পর রাষ্ট্রের ঘুম ভাঙবে?
২০২৬ অক্টোবর ১৭ ১৭:৩৪:৪৬
আল আমিন
‘বাচ্চাদের ভাত খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও। আমার আসতে একটু দেরি হবে, একটা নিউজ নিয়ে ব্যস্ত আছি।’ স্ত্রীকে বলা সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের এই কথাগুলো এখন একটি পরিবারের বুকফাটা বেদনার স্মৃতি। নেত্রকোনার দুর্গাপুরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি। রেখে গেছেন দুই অবুঝ সন্তান ও স্বামীহারা স্ত্রীকে। যে মানুষটি সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করতে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন, তাঁর নিজের মৃত্যুই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠল একটি পরিবারের সবচেয়ে নির্মম সংবাদ।
কিন্তু আলিফ ফকিরের মৃত্যু কি কেবল আরেকটি হত্যাকাণ্ডের খবর হয়ে সংবাদপত্রের পাতা থেকে হারিয়ে যাবে? কয়েক দিন আলোচনা, কিছু প্রতিবাদ, কিছু আশ্বাস—তারপর সব আগের মতো? বাংলাদেশের সাংবাদিক হত্যার ইতিহাস আমাদের বারবার এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। মানিক সাহা, হুমায়ুন কবির, দীপংকর চক্রবর্তী, সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির মতো সাংবাদিকদের নাম আজও তাঁদের নির্মম পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তাঁদের হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট ও বিচারিক অবস্থান এক নয়; কিন্তু এসব ঘটনা সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং অপরাধের জবাবদিহি নিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজকে কঠিন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
২০০৪ সালে খুলনায় সাংবাদিক মানিক সাহা বোমা হামলায় নিহত হন। একই বছর সাংবাদিক হুমায়ুন কবির ও দীপংকর চক্রবর্তীও হত্যার শিকার হন। ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে নিজ বাসায় খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি। তাঁদের পাঁচ বছর বয়সী সন্তানকে রেখে যাওয়া সেই হত্যাকাণ্ড আজও দেশের বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতার অন্যতম আলোচিত উদাহরণ। একের পর এক সময়সীমা পেছালেও মামলার তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে অনিশ্চয়তা জনমনে গভীর প্রশ্ন তৈরি করেছে।
২০২৫ সালের ৭ আগস্ট গাজীপুরে সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিন হত্যাকাণ্ডও সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিভিন্ন ঘটনায় গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া গেলেও গ্রেপ্তার, তদন্ত, বিচার ও চূড়ান্ত দণ্ড এক বিষয় নয়। প্রতিটি পর্যায়ের অগ্রগতি আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। শুধু আসামি গ্রেপ্তারের সংবাদ দিয়ে বিচার নিশ্চিত হয়েছে—এমন দাবি করার সুযোগ নেই।
প্রশ্ন হলো, সাংবাদিক হত্যার পর রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া কি কেবল তদন্ত শুরুর ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির এর আগেও হামলার শিকার হয়েছিলেন বলে জানা গেছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরের সেই হামলার সঙ্গে তাঁর বর্তমান হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি। তাঁর পেশাগত কাজ, সম্ভাব্য হুমকি, ব্যক্তিগত বিরোধ এবং হত্যার উদ্দেশ্য—সব দিক খতিয়ে দেখতে হবে। অনুমানের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী করা যাবে না; আবার কোনো সম্ভাবনাকেও অবহেলা করা চলবে না।
পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিত বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে এবং ঘটনাস্থল থেকে আগ্নেয়াস্ত্রের গুলির খোসা ও একটি অবিস্ফোরিত গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। এখন প্রয়োজন কথার চেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ। প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, সিসিটিভি ফুটেজ, ফরেনসিক আলামত এবং অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে হত্যাকারীদের শনাক্ত করতে হবে। কোনো পরিকল্পনাকারী বা সহযোগী জড়িত থাকলে প্রমাণ সাপেক্ষে তাকেও বিচারের আওতায় আনতে হবে।
সাংবাদিকের কলম থামিয়ে দেওয়ার অধিকার কারও নেই। সংবাদে আপত্তি থাকলে প্রতিবাদ করার সুযোগ আছে, আইনি প্রতিকারের পথ আছে। কিন্তু গুলি, হামলা কিংবা হত্যার মাধ্যমে সাংবাদিকের কণ্ঠ স্তব্ধ করার চেষ্টা শুধু একটি প্রাণের বিরুদ্ধে অপরাধ নয়; এটি মানুষের জানার অধিকার ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশের ওপরও আঘাত। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় গোটা সমাজ, কারণ অনিয়ম ও অপরাধের তথ্য প্রকাশের পথ সংকুচিত হয়ে পড়ে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাই শুধু হত্যার পর আসামি খোঁজা নয়; হুমকি ও হামলার অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে দেখা, পূর্ববর্তী অপরাধের তদন্ত করা এবং ঝুঁকিতে থাকা সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি। যে ঘটনায় গাফিলতি বা দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ ওঠে, তারও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন হওয়া উচিত। একই সঙ্গে তদন্ত যেন রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত কিংবা অন্য কোনো প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
এখানে আরেকটি নির্মম বাস্তবতা রয়েছে। সাংবাদিক নিহত হলে তাঁর পরিবার শুধু একজন প্রিয়জনকে হারায় না; অনেক ক্ষেত্রে হারায় পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকেও। আলিফ ফকিরের দুই সন্তান এখন বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত। তাঁর স্ত্রীকে একদিকে শোক সামলাতে হচ্ছে, অন্যদিকে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। রাষ্ট্র ও সাংবাদিক সংগঠনগুলোর উচিত পরিবারের প্রয়োজন অনুযায়ী আইনি, আর্থিক ও মানবিক সহায়তার ব্যবস্থা করা। তবে কোনো সহায়তাই হত্যার বিচার নিশ্চিত করার বিকল্প হতে পারে না।
আমরা চাই না, আলিফ ফকিরের হত্যাকাণ্ডও সময়ের সঙ্গে জনস্মৃতি থেকে হারিয়ে যাক। আমরা চাই না, তাঁর সন্তানদের একদিন বড় হয়ে প্রশ্ন করতে হোক—বাবার হত্যার বিচার কোথায়? আমরা চাই না, সাংবাদিক হত্যার পর প্রতিবারই একই দাবি তুলতে হোক, অথচ কার্যকর জবাবদিহি অনিশ্চিত থেকে যাক।
এখন প্রয়োজন স্পষ্ট জবাবদিহি। সাংবাদিক হত্যার মামলাগুলোর তদন্ত ও বিচারিক অগ্রগতি নিয়মিতভাবে জনসমক্ষে তুলে ধরতে হবে। দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা মামলাগুলোর প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে আইনসম্মতভাবে তা দূর করতে হবে। নতুন হত্যাকাণ্ডের তদন্ত দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করতে হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আর দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
রাষ্ট্রের কাছে আমাদের প্রশ্ন—আর কত সাংবাদিকের রক্ত ঝরলে নিরাপত্তা ও বিচার নিশ্চিত করার উদ্যোগ যথেষ্ট গুরুত্ব পাবে? আর কত পরিবারকে প্রিয়জনের হত্যার বিচার চেয়ে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে?
শোকবার্তা নয়, বিচার চাই। আশ্বাস নয়, জবাবদিহি চাই। তদন্তের নামে অনন্ত অপেক্ষা নয়, আইনের শাসনের বাস্তব প্রয়োগ চাই।
লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির হত্যার নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। তাঁর পরিবারকে সুরক্ষা ও সহায়তা দিতে হবে, আর অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে প্রমাণের ভিত্তিতে। কারণ সাংবাদিকের জীবন রক্ষা করা এবং হত্যার বিচার নিশ্চিত করা কোনো অনুগ্রহ নয়—এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সাংবাদিকের মৃত্যুতে সংবাদ থেমে যেতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচারের দাবি থামতে পারে না।
লেখক : প্রকাশক ও সম্পাদক-সে অলওয়েজ ট্রুথ।
