ঢাকা, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » পাঠকের লেখা » বিস্তারিত

শিক্ষিত বেকার বাড়ছে: কর্মসংস্থানে কার্যকর উদ্যোগ জরুরি

২০২৬ অক্টোবর ১৮ ১৮:৫২:৫১
শিক্ষিত বেকার বাড়ছে: কর্মসংস্থানে কার্যকর উদ্যোগ জরুরি

লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল


শিক্ষা মানুষের সম্ভাবনা বিকশিত করে, আত্মমর্যাদা বাড়ায় এবং উন্নত জীবনের পথ তৈরি করে। কিন্তু সেই শিক্ষা অর্জনের পরও যখন একজন তরুণ বছরের পর বছর কর্মসংস্থানের অপেক্ষায় থাকেন, তখন তাঁর ব্যক্তিগত স্বপ্নের পাশাপাশি প্রশ্নের মুখে পড়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কৌশল। বাংলাদেশে শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব এখন কেবল ব্যক্তিগত হতাশার বিষয় নয়,এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি জাতীয় সমস্যা। লাখো তরুণ শিক্ষাজীবন শেষ করে চাকরির বাজারে প্রবেশ করছেন, অথচ তাঁদের প্রত্যাশা, অর্জিত যোগ্যতা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়ে গেছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি কিংবা আশ্বাস যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টির উপযোগী অর্থনৈতিক পরিবেশ এবং সরকারের সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক উদ্যোগ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে সামগ্রিক বেকারত্বের হার ছিল ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ। কিন্তু উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। জরিপের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৪ সালে উচ্চশিক্ষিতদের বেকারত্বের হার বেড়ে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়ায় এবং বেকার স্নাতকের সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার। ২০২৩ সালে উচ্চশিক্ষিতদের বেকারত্বের হার ছিল ১৩ দশমিক ১১ শতাংশ। অর্থাৎ সামগ্রিক বেকারত্বের হার দিয়ে শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানের বাস্তবতা পুরোপুরি বোঝা যায় না। শিক্ষার স্তর অনুযায়ী বেকারত্বের পার্থক্য বিশ্লেষণ করা জরুরি।

একজন তরুণের পেছনে পরিবারের বহু বছরের আর্থিক বিনিয়োগ, অভিভাবকের ত্যাগ এবং ব্যক্তিগত পরিশ্রম জড়িয়ে থাকে। পড়াশোনা শেষ করে চাকরি না পেলে তাঁর নিজের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়, পাশাপাশি পরিবারের ওপরও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়। অনেক পরিবার জমি বিক্রি করে, ঋণ নিয়ে কিংবা দৈনন্দিন প্রয়োজন সংকুচিত করে সন্তানকে উচ্চশিক্ষিত করে তোলে। পরিবারের প্রত্যাশা থাকে, সন্তান কর্মজীবনে প্রবেশ করে নিজের অবস্থান গড়বে এবং একসময় পরিবারকেও সহায়তা করবে। কিন্তু দীর্ঘদিন বেকার থাকলে সেই প্রত্যাশা হতাশায় পরিণত হয়। তরুণের আত্মবিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়, পরিবারের আর্থিক চাপ বাড়ে এবং সমাজে হতাশা ও বৈষম্যের অনুভূতি গভীর হতে পারে।

বেকারত্বের সমস্যাকে শুধু চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা দিয়ে বিচার করলে চলবে না। দেখতে হবে, অর্থনীতিতে কী ধরনের কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে, নতুন বিনিয়োগ কতটা হচ্ছে, শিক্ষাব্যবস্থা শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং বিদ্যমান কর্মসংস্থানের মান কেমন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ২০২৪ সালের বাংলাদেশবিষয়ক বক্তব্যে বলা হয়েছিল, প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। একই বক্তব্যে সংস্থাটি উল্লেখ করে, অর্থনৈতিক অগ্রগতির তুলনায় কর্মসংস্থান বৃদ্ধির গতি পর্যাপ্ত ছিল না এবং উৎপাদন খাতে চাকরি সৃষ্টির গতি কমে যাওয়ার প্রভাব সেবা খাতেও পড়েছে। আইএলও আরও জানায়, ২০২২ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের বেকারত্বের হার ছিল ৮ শতাংশ এবং উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন ব্যক্তিদের মধ্যে এই হার ছিল ২৭ দশমিক ৮ শতাংশ। এখানে সময়কাল ও সংজ্ঞার পার্থক্য বিবেচনা করা জরুরি; ২০২২ ও ২০২৪ সালের তথ্য এক করে দেখা যাবে না। তবে বিভিন্ন জরিপের তথ্যই ইঙ্গিত করে, তরুণ ও উচ্চশিক্ষিতদের কর্মসংস্থান বিশেষ গুরুত্ব দাবি করে।

শিক্ষিত বেকারত্বের অন্যতম কারণ শিক্ষাব্যবস্থা ও কর্মক্ষেত্রের চাহিদার মধ্যে অসামঞ্জস্য। দেশের অনেক শিক্ষার্থী তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করলেও বাস্তব কাজের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, যোগাযোগদক্ষতা কিংবা দলগতভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ সীমিত পায়। ফলে সনদ থাকলেও চাকরির সাক্ষাৎকারে বা কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা প্রদর্শনে অনেকে পিছিয়ে পড়ে। অন্যদিকে নিয়োগদাতারা এমন কর্মী চান, যাঁরা প্রশিক্ষণ নিয়ে দ্রুত কাজ শুরু করতে পারবেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ এবং পাঠ্যক্রম উন্নয়নের নিয়মিত ব্যবস্থা না থাকলে এই ব্যবধান আরও বাড়ে।

বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের বাংলাদেশ উন্নয়নবিষয়ক প্রতিবেদনে শিক্ষিত তরুণ, বিশেষ করে নারী ও শহুরে তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান না থাকার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি এবং তৈরি পোশাকসহ বড় শিল্পে নতুন চাকরি তৈরির গতি সীমিত ছিল। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে দক্ষতার চাহিদা ও চাকরিপ্রার্থীদের যোগ্যতার মধ্যে ব্যবধানকেও গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চে প্রকাশিত আইএলওর একটি কর্মপত্রেও বাংলাদেশের শ্রমবাজারে অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান, অপ্রতুল কর্মসংস্থান এবং তরুণ ও নারীদের বিশেষ চ্যালেঞ্জের বিষয় উঠে এসেছে। এসব বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট, শিক্ষিত বেকারত্ব কমাতে শুধু শিক্ষার সুযোগ বাড়ালেই হবে না, শিক্ষা থেকে উৎপাদনশীল কর্মজীবনে প্রবেশের পথও সুগম করতে হবে।

শিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশের কর্মজীবনের প্রত্যাশা নির্দিষ্ট কয়েকটি ক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সরকারি চাকরির প্রতি আগ্রহের পেছনে চাকরির স্থায়িত্ব, সামাজিক মর্যাদা, নিয়মিত বেতন এবং অবসরকালীন সুবিধার মতো যৌক্তিক কারণ রয়েছে। কিন্তু সরকারি পদের সংখ্যা সীমিত হওয়ায় বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর সবাইকে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব নয়। বছরের পর বছর একই ধরনের নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে অনেকে কর্মজীবনে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ সময় হারান। কেউ কেউ অন্য পেশায় যেতে চান না, আবার কেউ উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, পুঁজি কিংবা তথ্যের অভাবে বিকল্প কর্মসংস্থানের পথ খুঁজে পান না। তাই সরকারি চাকরির প্রস্তুতিকে নিরুৎসাহিত করা নয়, বরং তরুণদের সামনে সম্মানজনক বেসরকারি চাকরি, দক্ষতাভিত্তিক পেশা, উদ্যোক্তা হওয়া এবং স্বনিয়োজিত কাজের বাস্তব সুযোগ তৈরি করাই হওয়া উচিত নীতিনির্ধারণের লক্ষ্য।

সরকারের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার দেওয়া। প্রবৃদ্ধির হার গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধি কতটা নতুন ও মানসম্মত চাকরি তৈরি করছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শিল্প, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পর্যটন, পরিবহন, লজিস্টিকস, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির মতো সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা দেশের কর্মসংস্থান সম্প্রসারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন। অথচ ঋণপ্রাপ্তির জটিলতা, উচ্চ পরিচালন ব্যয়, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা ও প্রশাসনিক জটিলতা অনেক উদ্যোক্তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে। এসব প্রতিবন্ধকতা কমিয়ে ব্যবসা শুরু ও সম্প্রসারণ সহজ করা গেলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।

সরকারি নীতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য থাকা প্রয়োজন। কোন খাতে কত নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে, প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের কতজন চাকরি পাবেন, কতজন উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবেন এবং নারী ও পিছিয়ে থাকা অঞ্চলের তরুণেরা কতটা সুযোগ পাবেন, এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সূচক নির্ধারণ করা জরুরি। শুধু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা কিংবা প্রকল্পে ব্যয়ের পরিমাণ দিয়ে সাফল্য বিচার করা যাবে না। প্রশিক্ষণের পর ছয় মাস বা এক বছর পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি চাকরি পেয়েছেন কি না, তাঁর আয় কতটা বেড়েছে এবং কাজটি কতটা স্থায়ী হয়েছে, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। অর্থাৎ প্রকল্পের কার্যক্রম নয়, বাস্তব কর্মসংস্থান ও জীবিকার উন্নতিই হবে সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি।

শিক্ষাব্যবস্থায়ও কার্যকর পরিবর্তন প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের পাঠ্যক্রম হালনাগাদ করতে হবে এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠান, নিয়োগদাতা ও পেশাজীবীদের সঙ্গে নিয়মিত পরামর্শের ভিত্তিতে দক্ষতার চাহিদা নির্ধারণ করতে হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে কম মর্যাদার বিকল্প হিসেবে দেখার প্রবণতা দূর করা জরুরি। আধুনিক যন্ত্র পরিচালনা, বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিকসের কাজ, নির্মাণ প্রযুক্তি, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, স্বাস্থ্যসেবা, যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণ, ডিজিটাল সেবা এবং অন্যান্য চাহিদাসম্পন্ন পেশায় মানসম্মত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টার্নশিপ, শিক্ষানবিশি এবং বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। এতে শিক্ষা শেষ করার পর কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সময় কমবে এবং নিয়োগদাতারাও দক্ষ কর্মী পাবেন।

ডিজিটাল অর্থনীতি ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। সফটওয়্যার, ডিজিটাল বিপণন, গ্রাফিক ডিজাইন, তথ্য বিশ্লেষণ, সাইবার নিরাপত্তা, অনলাইন সেবা ও অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর কাজে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে সুযোগ রয়েছে। তবে শুধু স্বল্পমেয়াদি কোর্স করিয়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। মানসম্মত প্রশিক্ষণ, বাস্তব প্রকল্পে কাজের অভিজ্ঞতা, ভাষাদক্ষতা, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, নিরাপদ ডিজিটাল লেনদেন এবং কাজ পাওয়ার উপযোগী পেশাগত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা জরুরি। প্রশিক্ষণের মান যাচাই ও ভুয়া কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও প্রয়োজন।

তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। সবাইকে চাকরিপ্রার্থী হিসেবে তৈরি না করে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী হিসেবেও প্রস্তুত করা প্রয়োজন। কিন্তু উদ্যোক্তা হওয়ার পরামর্শ দিলেই সমস্যার সমাধান হয় না। নতুন ব্যবসা শুরু করতে সহজ শর্তে অর্থায়ন, ব্যবসা পরিচালনার প্রশিক্ষণ, হিসাবরক্ষণ ও বিপণন সহায়তা, প্রযুক্তিগত পরামর্শ এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ দিতে হবে। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ওয়ান-স্টপ সেবা চালু করে নিবন্ধন, লাইসেন্স, করসংক্রান্ত তথ্য ও প্রয়োজনীয় অনুমোদনের প্রক্রিয়া সহজ করা যেতে পারে। ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত যোগাযোগের পরিবর্তে যোগ্যতা, ব্যবসায়িক সম্ভাবনা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সক্ষমতা গুরুত্ব পায়।

নারীদের কর্মসংস্থানে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া অপরিহার্য। নিরাপদ কর্মপরিবেশ, যাতায়াতের সুবিধা, শিশুযত্নের ব্যবস্থা, বৈষম্যহীন নিয়োগ এবং সমান কাজের জন্য ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত না হলে অনেক শিক্ষিত নারী শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে পারেন না কিংবা কর্মজীবন ধরে রাখতে পারেন না। একইভাবে গ্রাম ও শহরের তরুণদের সুযোগের ব্যবধান কমাতে স্থানীয় অর্থনীতির সম্ভাবনা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ ও বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। ঢাকাকেন্দ্রিক কর্মসংস্থানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শিল্প, কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবার বিকাশ ঘটাতে হবে।

বিদেশে কর্মসংস্থানও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তবে বিদেশগামী তরুণদের প্রশিক্ষণ, ভাষাজ্ঞান, স্বীকৃত সনদ এবং নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে হবে। দক্ষ কর্মী হিসেবে বিদেশে যেতে পারলে আয় ও পেশাগত অগ্রগতির সুযোগ বাড়ে। অন্যদিকে দালালের প্রতারণা, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, চুক্তির শর্ত ভঙ্গ এবং কর্মক্ষেত্রে অধিকারহীনতা তরুণদের ঝুঁকিতে ফেলে। তাই বিদেশে শ্রমবাজারের চাহিদা বিশ্লেষণ করে প্রশিক্ষণ, নিয়োগে স্বচ্ছতা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং দূতাবাসের মাধ্যমে শ্রমিকদের সুরক্ষা জোরদার করতে হবে। বিদেশে কর্মসংস্থানকে দেশের ভেতরে পর্যাপ্ত কাজ তৈরির বিকল্প হিসেবে দেখা যাবে না বরং এটি হতে হবে সমন্বিত কর্মসংস্থান কৌশলের একটি অংশ।

সমস্যার সমাধানে বেসরকারি খাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজেরও দায়িত্ব রয়েছে। নিয়োগদাতাদের বাস্তবসম্মত যোগ্যতার শর্ত নির্ধারণ, প্রবেশপর্যায়ের চাকরির সুযোগ বৃদ্ধি এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ করা উচিত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শুধু সনদ প্রদান নয়, শিক্ষার্থীদের কর্মজীবনের প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে। গণমাধ্যমে চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রচারের পাশাপাশি শ্রমবাজারের প্রকৃত চাহিদা, প্রশিক্ষণের সুযোগ, উদ্যোক্তাদের অভিজ্ঞতা এবং নিয়োগে অনিয়মের বিষয় তুলে ধরা প্রয়োজন। এতে তরুণেরা সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য পাবেন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি বাড়বে।

শিক্ষিত বেকারত্ব কমাতে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে নিয়মিত পরিকল্পনা ও অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে হবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপের পাশাপাশি শিক্ষাগত যোগ্যতা, বয়স, লিঙ্গ, অঞ্চল, পেশা ও কর্মসংস্থানের মান অনুযায়ী তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কোন বিষয়ে পড়াশোনা করা তরুণেরা কতদিনে চাকরি পাচ্ছেন, কোন দক্ষতার চাহিদা বাড়ছে এবং কোন প্রশিক্ষণ কর্মসংস্থানে কার্যকর ফল দিচ্ছে, এসব তথ্য সহজে পাওয়া গেলে সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও চাকরিপ্রার্থীরা বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগসংক্রান্ত বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয়ও জরুরি, যাতে একই ধরনের প্রকল্পে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় না হয় এবং প্রকৃত উপকারভোগীরা সহায়তা পান।

শিক্ষিত তরুণেরা বাংলাদেশের বোঝা নন, তাঁরা দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনাগুলোর একটি। তাঁদের জ্ঞান, শ্রম, উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগাতে পারলে উৎপাদন বাড়বে, নতুন উদ্যোগ গড়ে উঠবে, পরিবারের আয় উন্নত হবে এবং দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। বিপরীতে, দীর্ঘদিন তাঁদের কর্মক্ষমতা অব্যবহৃত থাকলে ব্যক্তি ও পরিবারের ক্ষতির পাশাপাশি জাতীয় মানবসম্পদেরও অপচয় ঘটে। তাই শিক্ষিত বেকারত্বকে কেবল চাকরিপ্রার্থীর সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, এটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। সরকারকে কর্মসংস্থানমুখী বিনিয়োগ, বাজারের চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা, মানসম্মত কারিগরি প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা সহায়তা, স্বচ্ছ নিয়োগ এবং কার্যকর তদারকির মাধ্যমে বাস্তব পরিবর্তন আনতে হবে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতকে নতুন চাকরি সৃষ্টি এবং তরুণদের দক্ষতা বিকাশে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। তরুণদের শুধু ডিগ্রি নয়, দক্ষতা অর্জন ও কাজের সুযোগ দিতে হবে; শুধু চাকরির আশ্বাস নয়, কর্মসংস্থানের বাস্তব পথ তৈরি করতে হবে। শিক্ষিত বেকারত্ব কমিয়ে তরুণদের উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করতে পারলেই দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন গতিশীল হবে এবং দারিদ্র্যমুক্ত সুখী-সুন্দর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। তাই এখন সবচেয়ে জরুরি হলো, শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ এবং তার দৃশ্যমান বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।

লেখক: শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক।