প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত
শেরে বাংলা থেকে বঙ্গবন্ধু: বাঙালি জাতির আত্মজাগরণ ও স্বপ্নের অবিচ্ছিন্ন অভিযাত্রা
২০২৬ অক্টোবর ২৬ ১৮:০৮:৫৭
মানিক লাল ঘোষ
বাঙালির রাজনৈতিক মুক্তি, স্বাধিকার ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামের সুদীর্ঘ ইতিহাসে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান—এই দুই ক্ষণজন্মা পুরুষ যেন একই সূত্রে গাঁথা দুটি প্রদীপ্ত নাম। ১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর বরিশাল জেলার ঝালকাঠির রাজাপুরের সাতুরিয়ার মাতুলালয়ে মিয়াবাড়িতে জন্মগ্রহণ করা বাংলার এই অবিসংবাদিত জননেতার জন্মবার্ষিকীতে আমাদের গভীর ও বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। শেরে বাংলা তাঁর সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে কৃষক প্রজা পার্টি ও কৃষক শ্রমিক পার্টির শীর্ষ প্রধান, অবিভক্ত বাংলার প্রথম শিক্ষামন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী, কলকাতার মেয়র, পরবর্তীতে পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে অধিষ্ঠিত ছিলেন। এই সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক যাত্রায় তিনি কৃষক প্রজা আন্দোলন, প্রজাস্বত্ব আইন সংস্কার, 'ঋণ সালিশি বোর্ড' গঠন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলার অবহেলিত মানুষের অধিকার আদায়ের যে অভূতপূর্ব ভিত্তি রচনা করেছিলেন; পরবর্তীকালে ইতিহাসের অনিবার্য প্রবাহে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই পলিমাটির জমিনে স্বাধীনতার বীজ বপন করে তাকে সফল ও সার্থক মহীরুহে রূপান্তর করেছিলেন। বাংলার মাটি, নদী ও মানুষের হৃদস্পন্দনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এই দুই মহান নেতার রাজনৈতিক দর্শন, আদর্শ ও কর্মপ্রবাহ মূলত একই অবিস্মরণীয় ইতিহাসের দুটি ভিন্ন সোনালী অধ্যায়।
১৯৩৮ সালের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটির শিশু কিশোরদের মাঝে আজও নেতৃত্ব বিকাশের মডেল, যখন গোপালগঞ্জের এক কিশোর শেখ মুজিব নির্ভীকচিত্তে বাংলার তৎকালীন প্রথম প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলার পথ আগলে দাঁড়িয়েছিলেন। দাবি ছিল সামান্য—স্কুলের জরাজীর্ণ ছাদ সংস্কার—কিন্তু সেই দাবির পেছনে যে সাহস ছিল, তা শেরে বাংলাকে মুগ্ধ করেছিল। তিনি সেদিন হয়তো এই কিশোরের চোখের মনিতে আগামীর স্বাধীন বাংলাদেশের ছবি দেখতে পেয়েছিলেন। রাজনীতির ময়দানে তাঁদের সম্পর্ক ছিল ‘নানা ও নাতি’র মতো এক সুমধুর আবহে ঘেরা। শেরে বাংলা কৌতুক করে বলতেন, “আমি বুড়া, তুই গুঁড়া।” কিন্তু এই ‘গুঁড়া’ বা কনিষ্ঠ নেতার ওপর যে তাঁর অগাধ আস্থা ছিল, তা প্রমাণিত হয় ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে, যার ফলশ্রুতিতে শেরে বাংলা পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন।
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি গড়ে উঠেছিল শেরে বাংলার অসাম্প্রদায়িক ও গণমুখী চেতনার ওপর। ১৯১৬ থেকে ১৯২১ সময়কালে যিনি অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের সভাপতি এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক পদে একই সাথে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন, সেই শেরে বাংলার উত্থাপিত ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের মধ্যেই নিহিত ছিল বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের প্রথম স্বপ্ন। বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে অনুধাবন করেছিলেন যে, শেরে বাংলা যে একাধিক রাষ্ট্রের ইঙ্গিত দিয়ে লাহোর প্রস্তাব করেছিলেন, তা-ই ছিল বাঙালির মুক্তির আসল সনদ। পরবর্তীকালে ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফার মূল সুরটিও ছিল সেই লাহোর প্রস্তাবের আধুনিক ও চূড়ান্ত সংস্করণ।
বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে অত্যন্ত আবেগের সাথে উল্লেখ করেছেন যে, শেরে বাংলা ছিলেন বাংলার মাটির প্রকৃত সন্তান। সাধারণ মানুষের মনে হক সাহেবের আসন ছিল এতই গভীরে যে, রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকলেও কেউ তাঁর বিরুদ্ধে কোনো কটূক্তি সহ্য করত না। এমনকি বঙ্গবন্ধুর নিজের পিতা ও পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা তাকে হক সাহেবের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ করতে নিষেধ করতেন। এটিই ছিল সেই সময়ের রাজনীতির এক অনন্য সৌজন্যবোধ।
১৯৩৭ সালে কৃষক প্রজা পার্টির মাধ্যমে তিনি যেভাবে বাংলার অবহেলিত কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তনের লড়াই শুরু করেছিলেন, তা ছিল অকল্পনীয়। ঋণের জালে জর্জরিত বাঙালি কৃষককে রক্ষা করতে তাঁর ‘ঋণ সালিশি বোর্ড’ গঠন আজও এক কালজয়ী পদক্ষেপ হিসেবে স্বীকৃত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। শেরে বাংলা যে শিক্ষার আলো জ্বালিয়েছিলেন, বঙ্গবন্ধু সেই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করেই ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের জন্মবার্ষিকীতে আজ আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে, তাঁর লড়াই এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ছিল মূলত একই চেতনার নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ। শেরে বাংলা চেয়েছিলেন শোষিত মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি, আর বঙ্গবন্ধু তাকে রাজনৈতিক রূপ দিয়ে উপহার দিয়েছেন একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। অ্যাডভোকেট জেনারেল থেকে গভর্নর—সকল দায়িত্বেই শেরে বাংলার কর্মময় জীবন ও আদর্শ বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি সংগ্রামে শক্তি জুগিয়েছিল। আজ এই বিশেষ দিনে বাংলার এই দুই মহানায়কের প্রতি রইল আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা। শেরে বাংলা যেখানে শেষ করেছিলেন, বঙ্গবন্ধু সেখান থেকেই শুরু করেছিলেন—আর তাঁদের এই সম্মিলিত স্বপ্নই আজকের আধুনিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
