ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » মুক্তচিন্তা » বিস্তারিত

চোখের আলো, জমি হারানোর বেদনা

২০২৬ অক্টোবর ৩০ ১৭:৩৪:১২
চোখের আলো, জমি হারানোর বেদনা

আবদুল হামিদ মাহবুব


এখানে লিখব কষ্ট ও আনন্দের এক কাহিনি। এমন কাহিনি আমরা প্রতিদিনই দেখি। কিন্তু সব কাহিনি আমাদের হৃদয়কে সমানভাবে নাড়া দেয় না। আজ এমনই একটি ঘটনা লিখতে ইচ্ছে হলো, যা আমাকে একই সঙ্গে আনন্দিত ও ব্যথিত করেছে।

আমাদের হাসপাতালটি একটি চক্ষু হাসপাতাল। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। আসেন মৌলভীবাজার সীমান্তবর্তী ভারতের কয়েক জেলার মানুষও। দুর্গাপূজার ছুটি শেষে গত শনিবার (২৪ অক্টোবর ২০২৬) হাসপাতাল খোলার প্রথম দিনেই প্রায় ৫০০ রোগী এসেছিলেন। তখনও যে ছুটির আমেজটা রয়ে গিয়েছিল। পরদিন রোববার (২৫ অক্টোবর) রোগীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৯৫০। শনিবার এমনই ব্যস্ত একটি দিনে আমাদের কনসালট্যান্ট চিকিৎসক ডা. বোরহান উদ্দিন স্বপন একটি শিশুকে সঙ্গে নিয়ে আমার কাছে এলেন। জানালেন, শিশুটির নাম সৌরভ সরকার। তার বাবা গুণ মনি সরকার একজন প্রান্তিক কৃষক ও বর্গাচাষি। ছেলের চোখের চিকিৎসার জন্য তিনি নিজের শেষ সম্বলটুকু, অর্থাৎ সামান্য জমিটুকুও বিক্রি করে দিয়েছেন।

সৌরভের দুই চোখেই দৃষ্টিশক্তি অত্যন্ত কম ছিল। চিকিৎসকদের পরামর্শ ছিল, অপারেশনের মাধ্যমে লেন্স সংযোজন করা হলে তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই আশায় সৌরভের মা সীমারাণী সরকার একাধিকবার আমাদের হাসপাতালে এসেছেন। চিকিৎসার খরচ সম্পর্কেও জেনেছেন। কিন্তু নিজেদের অসচ্ছলতার কথা কখনো আমাদের জানাননি। শেষ পর্যন্ত ছেলের চোখের আলো ফিরিয়ে দিতে জমিটুকু বিক্রি করে টাকা জোগাড় করেন তার বাবা। সেই টাকা দিয়ে আমাদের হাসপাতালে সৌরভের একটি চোখের অপারেশন করানো হয়। চোখে সংযোজন করা হয় উন্নত মানের লেন্স (দরিদ্র কোনো রোগী সাধারণত এমন লেন্স লাগান না)। অপারেশনের পর সৌরভ ভালো দেখতে শুরু করে। এরপর দ্বিতীয় চোখের চিকিৎসার জন্য আবারও হাসপাতালে আসে সে।

সৌরভের পরিবারের এই কষ্টের কথা আমরা জানতে পারি আমাদের হাসপাতালের নার্স ডলি বেগমের মাধ্যমে। প্রথমবার চিকিৎসা শেষে বাড়ি যাওয়ার সময় তিনি সৌরভের মায়ের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছিলেন, ছেলের চিকিৎসার জন্য তাদের জমি বিক্রি করতে হয়েছে। দ্বিতীয়বার হাসপাতালে এলে ডলি বিষয়টি আমাদের কনসালট্যান্ট চিকিৎসক ডা. বোরহান উদ্দিন স্বপনকে জানান। তিনিই সৌরভ ও তার মাকে আমার কাছে নিয়ে আসেন।

কথাটি শোনার পর আমার ভেতরে গভীর কষ্ট হলো। নিজেকে অপরাধীও মনে হলো। মনে প্রশ্ন জাগল, কেন আমরা আগে বিষয়টি জানতে পারলাম না? আগে জানতে পারলে হয়তো সৌরভের বাবাকে তার শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করতে হতো না।

আমি সীমারাণীকে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি কেন জমি বিক্রি করেছেন? তার উত্তরটি ছিল খুবই সরল, অথচ হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মতো। তিনি বললেন, “আমার ছেলের চোখের চেয়ে তো জমি আমার কাছে মূল্যবান নয়। তাই ছেলের চোখ ঠিক করার জন্য জমি বিক্রি করে দিয়েছি।” একজন মায়ের কাছে সন্তানের চেয়ে বড় সম্পদ আর কী হতে পারে! কথাটি শুনে আমার আর কিছু বলার ছিল না।

আমরা হাসপাতালের প্রশাসনিকভাবে খোঁজ নিলাম, জমি বিক্রির টাকা ফেরত দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা করা যায় কি না। সীমারাণীকেও জিজ্ঞেস করলাম, টাকা ফেরত পেলে তিনি জমিটি ফিরে পেতে পারবেন কি না। তিনি জানালেন, যিনি জমি কিনেছেন, তিনি আর ফেরত দেবেন না। তাছাড়া টাকা হাসপাতালের হিসাবে জমা হয়ে যাওয়ায় তা ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়াটিও বেশ জটিল।

এদিকে সৌরভের দ্বিতীয় চোখের অপারেশন বাকি। চিকিৎসক জানালেন, দ্বিতীয় চোখের অপারেশনও সফলভাবে সম্পন্ন করা গেলে সৌরভ দুই চোখেই ভালো দেখতে পারবে। আমি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিলাম, সৌরভের পরবর্তী চিকিৎসার যাবতীয় খরচ হাসপাতাল বহন করবে। প্রথম চোখে যে মানের উন্নত লেন্স সংযোজন করা হয়েছে, দ্বিতীয় চোখেও একই মানের লেন্স বিনামূল্যে দেওয়া হবে। অপারেশন, ওষুধপত্রসহ চিকিৎসার সব খরচ বহন করবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আমি এই হাসপাতাল পরিচালনার সাথে যুক্ত। আর ওই সময় আমাদের সাধারণ সম্পাদক উমরা পালনের জন্য ছুটিতে থাকায় আমিই দায়িত্ব পালন করছি।

গত ২৮ অক্টোবর সৌরভের দ্বিতীয় চোখের অপারেশন সম্পন্ন হয়েছে। প্রথম চোখের অপারেশনের সময় তাকে সম্পূর্ণ অজ্ঞান করতে হয়েছিল। কিন্তু এবার সে নিজেই চিকিৎসক ডা. বোরহান উদ্দিন স্বপনকে বলেছে, তাকে যেন অজ্ঞান না করেই অপারেশন করা হয়। শেষ পর্যন্ত শুধু ইনজেকশন দিয়েই অপারেশন সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।

আপারেশনের পরদিন সৌরভকে সামনে দেখে মনে হলো, তার দুই চোখেই যেন নতুন করে আলো ফিরেছে। চিকিৎসকও জানালেন, অপারেশন খুব ভালো হয়েছে। চশমা ছাড়াই সে দেখতে পারবে। ভবিষ্যতেও চশমার প্রয়োজন হবে না বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। চিকিৎসকের কাছ থেকে এমন সুসংবাদ শুনে মনটা আনন্দে ভরে গেল। সৌরভের মা বারবার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছিলেন। দ্বিতীয় চোখের অপারেশনের জন্য তাদের আর কোনো টাকা দিতে হয়নি। একজন মায়ের মুখে কৃতজ্ঞতার কথা শুনে ভালো লাগছিল, কিন্তু মনের ভেতরে একটা প্রশ্ন বারবার ফিরে আসছিল। ছেলের চোখের আলো ফিরেছে ঠিকই, কিন্তু তার বাবার হারানো জমি কি আর ফিরে আসবে?

সৌরভের সঙ্গে কথা বলে জানলাম, সে কখন থেকে চোখে কম দেখে, তা নিজেও জানে না। কীভাবে তার চোখের সমস্যাটি ধরা পড়েছিল, জানতে চাইলে সে জানাল, তখন সে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। একদিন তাদের চিলারাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজন ব্যক্তি গিয়ে বোর্ডে কিছু লিখেছিলেন। এরপর সৌরভকে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, বোর্ডে কী লেখা আছে। সে কিছুই পড়তে পারেনি। তখনই তার চোখ পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।

সৌরভের মা তাকে নিয়ে বানিয়াচং উপজেলার বিভিন্ন চক্ষু চিকিৎসকের কাছে গিয়েছিলেন। তারা পরীক্ষা করে চট্টগ্রামের একটি হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সেখানে চিকিৎসার জন্য দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা খরচ হতে পারে বলেও জানিয়েছিলেন। অবশেষে তারা মৌলভীবাজার বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতালে আসেন। কয়েকবার এসে চিকিৎসার খরচ সম্পর্কে জানার পরও টাকা জোগাড় করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত জমি বিক্রি করেই ছেলের একটি চোখের অপারেশন করিয়েছেন।

আমাদের হাসপাতালের পরিচালনা কমিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত রয়েছে। সেটি হচ্ছে; 'চোখের সমস্যা নিয়ে কেউ হাসপাতালের সীমানায় প্রবেশ করলে তার কাছে টাকা থাকুক বা না থাকুক, হাসপাতালের সামর্থ্য অনুযায়ী তাকে অবশ্যই চিকিৎসাসেবা দিতে হবে।' সৌরভের ক্ষেত্রে দুঃখজনকভাবে আমরা তার আর্থিক অসচ্ছলতার বিষয়টি আগে জানতে পারিনি। হয়তো আমাদের আরও একটু খোঁজ নেওয়া উচিত ছিল। হয়তো একটু আগে জানতে পারলে তার বাবাকে শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করতে হতো না।

সৌরভের চোখে আলো ফিরেছে। সে হয়তো মন দিয়ে পড়াশোনা করবে, বড় হবে, একদিন গুণী মানুষ হয়ে উঠবে। তার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা ভেবে আনন্দ হয়। কিন্তু তার বাবার হারিয়ে যাওয়া জমির কথা মনে হলে মনটা ভারী হয়ে আসে। সন্তানের চোখের আলো ফিরিয়ে দিতে একজন বাবা নিজের শেষ সম্বলটুকু বিসর্জন দিয়েছেন। সেই ত্যাগের মূল্য কোনো অর্থ দিয়ে পরিশোধ করা সম্ভব নয়। তবু মনে প্রশ্ন জাগে, আমরা কি কোনোভাবে তার হারানো সম্বল ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারতাম না? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো অনেক দিন আমার মনে ঘুরপাক খাবে। আমি কামনা করি, সৌরভ সুস্থ থাকুক, ভালো থাকুক। তার পরিবারের সবার জীবন সুখ, শান্তি ও স্বাচ্ছন্দ্যে ভরে উঠুক। তার চোখের আলো যেন তাদের জীবনের অন্ধকারও দূর করতে পারে।

এই লেখার সঙ্গে আমাদের কনসালট্যান্ট চিকিৎসক ডা. বোরহান উদ্দিন স্বপন, সৌরভের মা সীমারানি সরকার এবং চোখের দৃষ্টি ফিরে পাওয়া ছোট্ট সৌরভের ছবি প্রকাশ করছি। সৌরভ ও তার মায়ের অনুমতি নিয়েই ছবিটি পোস্ট করা হলো। সৌরভ সরকারের বাড়ি হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলার চিলারাই গ্রামে। তার জন্য সবাই দোয়া করবেন।

একটি শিশুর চোখে আলো ফিরেছে, এ আমাদের আনন্দ। কিন্তু সেই আলো ফিরিয়ে দিতে তার পরিবারকে যে মূল্য দিতে হয়েছে, সেটিই আমাদের বেদনা। এই আনন্দ ও বেদনার মাঝখানেই লুকিয়ে আছে আমাদের মানবিক দায়িত্বের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

লেখক : যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মৌলভীবাজার বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতাল, বাংলাদেশ।