প্রচ্ছদ » জাতীয় » বিস্তারিত
‘গ্রীষ্মের আগেই জাতীয় গ্রিডে ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ’
২০২৬ নভেম্বর ০৩ ১৫:০৬:৫০
স্টাফ রিপোর্টার : আগামী গ্রীষ্ম মৌসুম শুরুর আগেই জাতীয় গ্রিডে ৩ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেন, “সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে অর্থায়ন সহজ করতে সরকার প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার তহবিল বরাদ্দ করেছে। পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা হবে।”
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘বাংলাদেশ সোলার এক্সপো-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “স্বনির্ভর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জন সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। নিজস্ব উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে সোলার এক্সপোর আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনাময় খাত নয়, বরং অনিবার্য বাস্তবতা।”
তিনি বলেন, “দেশে একসময় বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানিনির্ভরতা তৈরি করা হয়েছিল। বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আমদানি প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহে সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার বিদ্যুৎ খাতে ৪৩ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে।”
চলতি অর্থবছরেও বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় একই রকম রয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, “পরিস্থিতি মোকাবিলায় ডিজেলের মজুত বাড়ানো হয়েছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য কয়লার সরবরাহ ও মজুত নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিকল্প সরবরাহকারীদের সঙ্গেও যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ইতোমধ্যে ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বিগত সরকারগুলোর ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনায় সময়ক্ষেপণ না করে আগামী দিনে বিদ্যুতের চাহিদা কীভাবে মেটানো যায় এবং বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, সেটিই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।”
তিনি বলেন, “জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতে জনগণের ভোগান্তি সম্পর্কে সরকার সচেতন। চলমান সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা, বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় ও চুক্তি পর্যালোচনা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা এবং দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে সরকার একযোগে কাজ করছে।”
প্রধানমন্ত্রী জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ দেশের প্রতিটি মানুষের সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। উদ্যোক্তারাই এ উদ্যোগের মূল চালিকাশক্তি।
সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ও সম্প্রসারণ সহজ করতে সরকার ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ ২০২৬’ প্রণয়ন করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, “এ খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে নীতিগত সহায়তা, কর ও শুল্ক সুবিধা এবং আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।”
তারেক রহমান বলেন, “সরকারি-বেসরকারি অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়ির অব্যবহৃত ছাদ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করতে চায় সরকার। নেট মিটারিং ব্যবস্থার আওতায় নিজস্ব ব্যবহারের পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করলে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে প্রণোদনাসহ প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে তা কিনবে সরকার।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে তরুণদের উদ্ভাবনী ধারণাকে কাজে লাগাতে চলতি বাজেটে স্টার্টআপের জন্য বছরে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। অর্থের অভাবে যেন তরুণদের কোনো উদ্ভাবনী ধারণা হারিয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করতে চায় সরকার। সোলার এক্সপোতে তিন শতাধিক তরুণ-তরুণী নতুন ধারণা উপস্থাপন করেছেন। তাদের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, একটি উদ্ভাবনী ধারণাই বাংলাদেশের জন্য গেম চেঞ্জার হতে পারে।”
নিজের বাসায়ও সৌর প্যানেল স্থাপনের কথা জানিয়ে তারেক রহমান জানান, বাসায় ব্যবহারের পর অতিরিক্ত কিছু বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি।
সৌরবিদ্যুৎ খাতের উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “একটি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের পর সেটি ঠিকমতো কাজ করছে কি না, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে কি না এবং গ্রাহক প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন কি না, সেদিকে নজর রাখতে হবে। এ খাতে আট হাজারের বেশি নতুন সার্ভিস প্রোভাইডার প্রতিষ্ঠান সম্পৃক্ত রয়েছে।” বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকেও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে তাদের সমস্যা ও সম্ভাবনার বিষয়ে আন্তরিক হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
কৃষি খাতেও সৌরবিদ্যুতের ব্যাপক সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, “পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্পকে সৌরচালিত পাম্পে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমবে, পরিবেশ সংরক্ষিত হবে এবং জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে। একইভাবে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে হিমাগার, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও গ্রামীণ ক্ষুদ্র উদ্যোগের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা সম্ভব।”
বিদ্যুতের সাশ্রয়ী ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, “জনগণের চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন সরকারের দায়িত্ব, আর বিদ্যুতের সঠিক ও সাশ্রয়ী ব্যবহার জনগণের দায়িত্ব।” দিনের বেলায় প্রাকৃতিক আলো-বাতাস ব্যবহার এবং বাসাবাড়ি, অফিস ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অপ্রয়োজনে বাতি, ফ্যান ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি বন্ধ রাখার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী উন্নয়ন সহযোগীদের বড় প্রকল্পের পাশাপাশি স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশিদের এ খাতে বিনিয়োগের সুযোগ কাজে লাগানোর আহ্বান জানান তিনি।
তারেক রহমান বলেন, সোলার এক্সপো যেন কেবল দুই দিনের প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ না থাকে। এ আয়োজন থেকে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি, ব্যাংক ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে সংযোগ এবং তরুণদের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়া প্রয়োজন। প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের বাস্তব উদ্যোগ গড়ে তোলার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, অর্থসচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মিরানা মাহরুখ।
(ওএস/এএস/নভেম্বর ০৩, ২০২৬)
