ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » পাঠকের লেখা » বিস্তারিত

বৈশ্বিক রাজনীতি: ক্ষমতার মহাকাব্য ও সভ্যতার ট্র্যাজেডি

২০২৬ নভেম্বর ০৩ ১৯:১৫:০২
বৈশ্বিক রাজনীতি: ক্ষমতার মহাকাব্য ও সভ্যতার ট্র্যাজেডি

আব্দুস সোবাহান


মানুষ যখন প্রথম সীমানা চিহ্নিত করেছিল, তখনই জন্ম নিয়েছিল রাজনীতির আদিমতম অধ্যায়—'স্বার্থ' ও 'ভয়'। আপাতদৃষ্টিতে বিশ্বরাজনীতি রাষ্ট্রসমূহের সামরিক প্রতিযোগিতা, অর্থনৈতিক আধিপত্য কিংবা কূটনৈতিক দাবার চাল বলে মনে হলেও এর গভীরে স্পন্দিত হয় মানবচেতনার এক চিরন্তন অস্তিত্বগত সংকট। এটি মূলত মানবজাতির সেই আদিম মানসিকতা—যেখানে সর্বগ্রাসী অনিরাপত্তা থেকে মুক্তি পেতে মানুষ যেমন রাষ্ট্র গড়েছিল, তেমনি রাষ্ট্রসমূহও আজও এক অনিয়ন্ত্রিত, সার্বক্ষণিক আশঙ্কার অরণ্যে বিচরণ করে। আলবেয়ার কামু বা জঁ-পল সার্ত্রের অস্তিত্ববাদী দর্শনের মতোই এই দাবার চালে ব্যক্তি মানুষের নৈতিকতা ও আত্মসত্তা পিষ্ট হয় রাষ্ট্রীয় স্বার্থের কঠিন জাঁতাকলে। ক্ষমতার এই নিরন্তর পিপাসা এবং অস্তিত্ব রক্ষার আকুলতাই বৈশ্বিক রাজনীতির আসল চালিকাশক্তি।

ইতিহাসের ধূলিমলিন গুটিকা উন্মোচন করলে দেখা যায়, শক্তির কেন্দ্র পরিবর্তিত হলেও ক্ষমতার আদিম ব্যাকরণ অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে। প্রাচীন গ্রিসের পেলোপনেশীয় যুদ্ধের রক্তক্ষয়ী প্রাঙ্গণ থেকে শুরু করে প্রাচ্যের চাণক্য কিংবা মধ্যযুগীয় আরব চিন্তাবিদ ইবনে খালদুনের বর্ণিত ‘আসাবিয়াহ’ (সামাজিক সংহতি ও ক্ষমতার উত্থান-পতনের চক্র)—সর্বত্রই একই সত্য প্রতিধ্বনিত হয়। প্রতিটি যুগ এক নতুন প্রভুর জন্ম দেয়, যার বিপরীতে অবস্থান নেয় নতুন কোনো প্রতিপক্ষ। এক সভ্যতার উত্থান ঘটে, পূর্ণতায় পৌঁছায় এবং পরে অভ্যন্তরীণ শিথিলতা ও নতুন শক্তির ধাক্কায় কালের গহ্বরে তলিয়ে যায়। রেনেসাঁসের নির্মম বাস্তবতাবাদ থেকে শুরু করে আধুনিক মহাদেশীয় দর্শন—সবকিছুর কেন্দ্রে বিরাজমান কেবলই আধিপত্যের চিরন্তন প্রবৃত্তি; শক্তি ও ক্ষমতার স্থান পরিবর্তিত হয়, কিন্তু দ্বন্দ্বে মগ্ন মানুষের সহজাত মনস্তত্ত্ব বদলায় না।

অথচ এই অমোঘ সংঘাতই রাজনীতির একমাত্র সত্য নয়। বৈশ্বিক মহাকাব্যের অন্য পিঠে রয়েছে টিকে থাকার এক নিভৃত বাসনা। মানবজাতি যখনই শেক্সপিয়রীয় ট্র্যাজেডির মতো নিজের তৈরি ধ্বংসস্তূপে পতিত হয়েছে, তখনই ভস্মাবশেষ থেকে জন্ম নিয়েছে নতুন কোনো যৌথ সুবাতাস। আত্মরক্ষার তাগিদেই মানুষ বারবার বহুপাক্ষিক শৃঙ্খলার আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর এই সন্ধিক্ষণে এসে ভূরাজনৈতিক সংঘাতের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে মানবজাতির চরম পরিবেশগত সংকট ও ইকোসিস্টেমের পতন। মানুষ যখন ভূখণ্ডের কাল্পনিক সীমানা নিয়ে রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে মত্ত, তখন জলবায়ুর পরিবর্তন ও প্রকৃতির ক্ষোভ কোনো সীমান্ত মানছে না। যে ভূরাজনীতি পৃথিবীর অস্তিত্বকে অস্বীকার করে, তা মূলত আত্মহত্যারই শামিল।

একই সাথে, ক্ষমতার পুরোনো ভৌগোলিক সীমানা ভেঙে আজ তৈরি হচ্ছে এক অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। সামরিক শক্তি কিংবা ভূমির দখলের চেয়ে আজ তথ্যের সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণ, অ্যালগরিদম ও ডিজিটাল নজরদারি হয়ে উঠেছে প্রভাব বিস্তারের নতুন অদৃশ্য অস্ত্র। মানুষের চিন্তাজগৎ ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা আজ এক সূক্ষ্ম বায়োপলিটিক্সের বেড়াজালে বন্দি। যে প্রযুক্তি মানুষকে মুক্ত করার কথা ছিল, তা-ই আজ মানবজাতিকে এক মহাজাগতিক নজরদারির অধীনে পরিচালিত করছে।

একবিংশ শতাব্দীর এই অস্থির প্রহরে পুরোনো একমেরু কেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য ভেঙে গিয়ে জন্ম নিচ্ছে এক অনিশ্চিত বহুধ্রুবীয় প্রতিযোগিতা। পরাশক্তিগুলোর সামরিক মহড়া, অর্থনৈতিক অবরোধের সূক্ষ্ম লড়াই এবং প্রক্সি সংঘাতের দাবানলে আজ আন্তর্জাতিক বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলো তাদের কার্যকারিতা হারাচ্ছে। কূটনীতির ভাষা যখন অস্ত্রের হুঙ্কারে ঢাকা পড়ে যায়, তখন আধুনিক মানবজাতি বুঝতে পারে—অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে আজ আমরা বিশ্বশান্তির সবচেয়ে ভঙ্গুর রূপটি প্রত্যক্ষ করছি।

রাজনীতি মূলত কালের আয়না—বালুর ওপর আঁকা মানচিত্রের মতো, যা কালস্রোতের এক ঝাপটাতেই মুছে যায়। যে রোমান সাম্রাজ্য, অটোমানদের প্রাবল্য কিংবা আধুনিক পরাশক্তিগুলোর প্রতাপ একসময় অবিনশ্বর মনে হয়েছিল, তা ইতিহাসের নিয়মেই ক্ষয়িষ্ণু। সভ্যতার এই দীর্ঘ নাট্যে পরম সত্য একটাই—ক্ষমতার ঔদ্ধত্য ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু মানবজাতির টিকে থাকার মহৎ তাগিদ চিরন্তন। শক্তির ভারসাম্য ও অন্ধ আধিপত্যের রাজনীতি কি আমাদের পরিবেশগত ও পারমাণবিক এক চূড়ান্ত নিঃশব্দতার দিকে নিয়ে যাবে, নাকি প্রজ্ঞা ও মানবিক বোধের আলোয় মানুষ রচনা করবে এক নতুন বিশ্বনীতি? এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার ওপরই নির্ভর করছে কালজয়ী মহাকাব্যের শেষ দৃশ্য।

লেখক: শিক্ষক, কবি ও কলামিস্ট।