ঢাকা, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩

প্রচ্ছদ » দেশের খবর » বিস্তারিত

ফিড, ওষুধ ও বিদ্যুতের চড়া দামে কুড়িগ্রামের খামারিদের মাথায় হাত

২০২৬ নভেম্বর ০৬ ১৮:৫৪:০১
ফিড, ওষুধ ও বিদ্যুতের চড়া দামে কুড়িগ্রামের খামারিদের মাথায় হাত

পিএম সৈকত, কুড়িগ্রাম : খামারজুড়ে হাজার হাজার মুরগি। প্রতিদিন খাবার, ওষুধ, বিদ্যুৎ, শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন মুরগী খামারিরা। একদিকে বাড়ছে উৎপাদন উপকরণের দাম, অন্যদিকে কমছে মুরগি ও ডিমের বিক্রয়মূল্য। ফলে ঋণ ও সঞ্চয়ের টাকা বিনিয়োগ করে গড়ে তোলা খামার টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে।উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি অনিশ্চয়তায় পড়েছে এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত কয়েক’শ শ্রমিকের জীবিকাও।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকালে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বিভিন্ন খামার ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। ব্রয়লার খামারিরা ফিড, বাচ্চা ও ওষুধের বাড়তি দামে দিশেহারা। অন্যদিকে ডিম উৎপাদনকারী খামারিরাও উৎপাদন খরচের তুলনায় সামান্য বেশি দামে ডিম বিক্রি করছেন।

উপজেলার বাছড়া এলাকার আহসান পোল্ট্রি ফার্ম ও চাকিরপশার তালুক গ্রামের ভাই ভাই পোল্ট্রি ফার্মে যথাক্রমে ১ হাজার ও ৫ হাজার ব্রয়লার মুরগি পালন করা হয়। খামার দু’টির হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে প্রতি বস্তা ফিডের দাম ছিল ৩ হাজার ৩০০ টাকা, অক্টোবরে তা বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৫০০ টাকা। দুই খামারে মাসে ৩৬০ বস্তা ফিড প্রয়োজন হয়। এতে শুধু ফিডের দাম বাড়ার কারণে মাসিক ব্যয় বেড়েছে ৭২ হাজার টাকা।

এ ছাড়া প্রতিটি মুরগির বাচ্চার দাম ৩২ টাকা থেকে বেড়ে ৪৪ টাকা হয়েছে। রেস্টলিফ, টু প্লাস ও খাবার স্যালাইনসহ বিভিন্ন ওষুধের দামও বেড়েছে। তুষের দাম কেজিতে ১০ টাকা থেকে ১৫ টাকা এবং কাঠের গুঁড়ার বস্তা ২০০ টাকা থেকে বেড়ে ৩০০ টাকা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিলও দুই খামারে মাসে ২ হাজার টাকা করে বেড়েছে।

অন্যদিকে সেপ্টেম্বর মাসে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৪২ টাকা দরে বিক্রি হলেও অক্টোবরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১২৮ টাকায়। অর্থাৎ কেজিতে দাম কমেছে ১৪ টাকা। এর প্রভাব পড়েছে খামার দু’টির বিক্রির আয়ে। আহসান পোল্ট্রি ফার্মে সেপ্টেম্বরে ১ হাজার ৯৯৫ কেজি মুরগি বিক্রি করে আয় হয়েছিল ২ লাখ ৮৩ হাজার ২৯০ টাকা। অক্টোবরে ১ হাজার ৮০০ কেজি বিক্রি করে আয় হয়েছে ২ লাখ ৩০ হাজার ৪০০ টাকা। এক মাসে আয় কমেছে ৫২ হাজার ৮৯০ টাকা।

অন্যদিকে ভাই ভাই পোল্ট্রি ফার্মে সেপ্টেম্বরে ১২ লাখ ৭৮ হাজার টাকার মুরগি বিক্রি হলেও অক্টোবরে বিক্রি হয়েছে ১১ লাখ ৬৪ হাজার ৮০০ টাকার। আয় কমেছে ১ লাখ ১৩ হাজার ২০০ টাকা। দুই খামার মিলিয়ে এক মাসে বিক্রির আয় কমেছে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৯০ টাকা। এর বাইরে উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় তো রয়েছেই।

আহসান পোল্ট্রি ফার্মের স্বত্বাধিকারী আহসান হাবীব হাসান বলেন, ‘ফিড, বাচ্চা, ওষুধ, বিদ্যুৎ বিল ও গাড়িভাড়াসহ সবকিছুর দাম বাড়ছে। অথচ মুরগি বিক্রি করতে হচ্ছে কম দামে। তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে ঋণ করে খামার শুরু করেছিলাম। এখন সেই ঋণ পরিশোধ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।’

তিনি জানান, সোনালি ব্যাংক ও ব্যুরো বাংলাদেশ এনজিও থেকে মোট ৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে খামার শুরু করেছেন।

একই সংকটে রয়েছেন নাজিমখান ইউনিয়নের মনিডাকুয়া গ্রামের খামারি আতিকুর রহমান ও রবিউল ইসলাম। আতিকুর রহমান বলেন, আগে সব খরচ বাদ দিয়ে মাসে প্রায় ২০ হাজার টাকা লাভ হত। এখন উৎপাদন খরচ যেভাবে বাড়ছে, তাতে সেই লাভ থাকবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।

রবিউল ইসলাম বলেন, লাভের কথা বাদ দিয়ে এখন আসল পুঁজি টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
শুধু ব্রয়লার নয়, ডিম উৎপাদনকারী খামারিরাও বিপাকে রয়েছেন। বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের সুখদেব গ্রামের খামারি আবুল কালামের সাড়ে ৫হাজার মুরগি রয়েছে। তার ভাষ্য, বর্তমানে একটি ডিম উৎপাদনে খরচ পড়ছে সাড়ে ৮ থেকে ৯ টাকা। অথচ বিক্রি করতে হচ্ছে ৯ থেকে সাড়ে ৯ টাকায়। ফলে লাভ থাকছে খুবই সামান্য, কখনোই লোকসানও গুনতে হচ্ছে।

সংকটের প্রভাব পড়ছে শ্রমিকদের ওপরও। ডিম উৎপাদনকারী একটি খামারের কর্মচারী একরামুল হক বলেন, ‘মহাজন লাভ করতে না পারলে শ্রমিকরা কীভাবে বাঁচবে?’ একই খামারের কর্মচারী মিলন জানান, ডিমের দাম কমে গেলে খামারের খরচ কমাতে তিনজনের জায়গায় দু’জন কর্মচারী দিয়ে কাজ চালানো হয়। এতে তাদের চাকরি হারানোর ভয় তৈরি হয়।

কুড়িগ্রাম জেলা পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি লিয়াকত আলী রিটু বলেন, অনেক উদ্যোক্তা পুঁজি হারিয়ে ইতিমধ্যে পোল্ট্রি ব্যাবসা ছেড়ে দিয়েছেন। খামারিদের টিকিয়ে রাখতে ফিড ও ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং বাণিজ্যিক হারের পরিবর্তে কৃষকদের মতো বিশেষ হারে বিদ্যুৎ বিল নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কুড়িগ্রামে বর্তমানে ২৭৫টি পোল্ট্রি খামার রয়েছে। এসব খামার থেকে প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ ডিম উৎপাদিত হয়। রাজারহাট উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রহমত আলী বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় উপকরণের মূল্যবৃদ্ধিতে খামারিরা বিপাকে পড়েছেন। অন্যদিকে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, ফিডের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক হ্রাস ও বিদ্যুৎ বিলে ভর্তুকির বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে খামারিরা কিছুটা স্বস্তি পাবেন।

(পিএস/এসপি/নভেম্বর ০৬, ২০২৬)