প্রচ্ছদ » দেশের খবর » বিস্তারিত
যশোরেশ্বরী কালীমন্দিরে মাকালীর মুকুট চুরির মামলা, শুনানি পিছিয়ে ১৯ জানুয়ারি
২০২৬ নভেম্বর ০৮ ১৮:২৭:২৫
রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরার শ্যামনগরের যশোরেশ্বরী কালীমন্দিরের মুকুট চুরির ঘটনায় বাদির উপস্থিতিতে দাখিলকৃত অভিযোগপত্রের উপর শুনানী আগামি ১৯ জানুয়ারি ধার্য করা হয়েছে। নির্ধারিত বিচারক ছুটিতে থাকায় ও বাদি হাজির না থাকায় রবিবার শুনানী করা সম্ভব হয়নি। গোয়েন্দা, অপরাধ ও তদন্ত শাখার সাতক্ষীরার উপপরিদর্শক মাসুদ পারভেজ গত ১৭ মার্চ আদালতে দুইজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
অভিযোগপত্রে উল্লেখিত আসামীরা হলেন, শ্যামনগরের ঈশ্বরীপুর গ্রামের মৃত ছিদাম সরকারের স্ত্রী রেখা সরকার (৪০) ও ঢাকার কদমতলীর শেখ শফি মাহমুদের ছেলে সম্রাট ফারুখ মাওলা (৪২)।
মামলার বিবরনে জানা যায়, ২০২১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর মোদী শ্যামনগরে এসে যশোরেশ্বরী কালী মন্দিরে পূজা দেন। এ সময় তিনি কালী মাতাকে একটি সোনার মুকুট পরিয়ে দেন। ২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর দুপুর দুইটা ১০ মিনিট থেকে দুইটা ৩৯ মিনিটের মধ্যে আল আমিন বা স্বপন নামের এক যুবক ওই মুকুট চুরি করে নিয়ে যায়।
এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ মন্দিরের সেবাইত ও পরিচ্ছন্ন কর্মী ঈশ্বরীপুর গ্রামের রেখা সরকার, একই গ্রামের অপূর্ব কুমার সাহা, সঞ্জয় বিশ্বাস ও শ্রীফলকাটি গ্রামের পারুল বিশ্বাস ও মন্দিরের পুরোহিত দীলিপ চক্রবর্তীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে। এ ঘটনায় মন্দিরের পক্ষ থেকে ঈশ্বরীপুর গ্রামের কালিকানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের ছেলে জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় বাদি হয়ে কারো নাম উল্লেখ না করে ১২ অক্টোবর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। পুরোহিত দীলিপ চক্রবর্তীকে ছেড়ে দিয়ে অন্য চারজনকে ১২ অক্টোবর সন্ধ্যায় সাত দিনের রিমাণ্ড চেয়ে আদালতে পাঠায় মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক আহম্মদ কবীর। ১৩ অক্টোবর পরিচ্ছন্ন কর্মী রেখা রানী সরকার চুরির সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে বিচারিক হাকিম সুজাতা আমিনের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। স্বীকারোক্তিতে দুই লাখ টাকার লোভে সে মন্দিরের তালা খুলে রেখে ব্রাহ্মনবাড়িয়ার আখাউড়ার আল আমিন বা স্বপন নামের এক যুবককে ওই মুকুট চুরিতে সহযোগিতা করেন বলে উল্লেখ করেন রেখা। একইসাথে ঢাকার কদমতলীর সম্রাট ফারুখ মাওলার (৪২) সাথে তার সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন। ওই বছরের ২১ অক্টোবর ঢাকার রামপুরা থেকে সম্রাট ফারুখ মাওলা ও তার বাবা শেখ শফি মাহমুদকে গ্রেপ্তার করা হয়। সম্রাট ফারুখ মাওলা ২৩ অক্টোবর সাতক্ষীরার বিচারিক হাকিম মহিদুল ইসলামের কাছে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।পুলিশ প্রতিবেদন না আসা পর্যন্ত সাতক্ষীরা জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে ২০২৪ সালের ২০ নভেম্বর সঞ্জয় বিশ্বাস, ২৮ নভেম্বর পারুল বিশ্বাস ও অপূর্ব বিশ্বাস জামিনে মুক্তি পান। রেখা রানী সরকার ২০২৫ সালের ৬ এপ্রিল মহামান্য হাইকোর্ট থেকে রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থায়ী জামিন লাভ করেন। শেখ শফি মাহমুদ ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল এক বছরের জন্য জামিন লাভ করেন। তবে গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরা জজ কোর্ট স¤্রাট ফারুখ মাওলার জামিন না’মঞ্জুর করার পর উচ্চ আদালতে রুল নিষ্পত্তি না থাকায় ৮ নভেম্বর রবিবার পর্যন্ত জামিন পাননি।
মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা সাতক্ষীরার গোয়েন্দা অপরাধ ও তদন্ত শাখার পুলিশ পরিদর্শক মাসুদ পারভেজ জানান. রেখা রানী সরকার ও সম্রাট ফারুখ মাওলার নাম উল্লেখ করে গত ১৭ মার্চ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় পারুল বিশ্বাস, সঞ্জয় বিশ্বাস, অপূর্ব সাহা ও শেখ শফি মাহমুদকে মামলা থেকে অব্যহতি দেওয়া হয়েছে। মামলায় ১৫ জনকে সাক্ষী শ্রেণীভুক্ত করা হয়েছে। ভিডিও ফুটেজে মূল অভিযুক্ত আল আমিন বা স্বপনকে সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। উদ্ধার করা যায়নি মায়ের মুকুট।
এদিকে রাষ্ট্রপক্ষের জিপি অ্যাড. অসীম মণ্ডল জানান, যশোরেশ্বরী কালী মন্দিরের মুকুট চুরির ঘটনাটি স্পর্শকাতর। সিসি টিভিতে দেখা চোরের পরিচয় তদন্তকারি কর্মকর্তা নিশ্চিত হতে পারেননি। আবার প্রতিবেশী এক রাষ্ট্রপ্রধানের দেওয়া মুকুটটি স্বর্ণের না রুপার উপর গোল্ডেন রং করা তা আজো প্রশ্নবিদ্ধ। তাছাড়া মুকুটটি উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ ও সিআইডি। তাছাড়া এ ধরণের একটি সর্বিজনীন মন্দিরে কোন পরিচালনা কমিটি না থাকা ও মন্দির থেকে অর্জিত প্রণামির অর্থ ও দানের টাকা ও সম্পদ নিয়ে বাদি ও পুরোহিতের ভূমিকা নিয়ে স্থানীয়ভাবে ক্ষোভ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বাদির ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। তাই মামলাটি আরো তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
সাতক্ষীরা আদালতের পুলিশ পরিদর্শক মোঃ নাজমুল হোসেন জানান, শ্যামনগরের যশোরেশ^রীপুর কালীমন্দিরের মায়ের মুকুট চুরির মামলায় আদালতে গত ১৭ মার্চ অভিযোগপত্র পাঠানো হয়। যাহা গত ২১ এপ্রিল অনলাইনে এসেছে। আগামি ১০ জুন আদালতে ধার্য দিনে অভিযোগপত্র উপস্থাপন করা হলে বাদির উপস্থিতিতে অভিযোগপত্রের উপর শুনানীর জন্য প্রথমে ১৯ আগষ্ঠ ও পরে ০৮ নভেম্বর দিন ধার্য করা হয়। রবিবার বাদি আদালতে আসেননি ও নির্ধারিত বিচারক ছুটিতে থাকায় ভারপ্রাপ্তর বিচারক মেহেদী হাসান শুনানী না করে আগামি ১৯ জানুয়ারি দিন ধার্য করেছেন।
প্রসঙ্গত, ঈশ্বরীপুরের জ্যোতি প্রকাশ চট্টোপাধায় রুপার উপর সোনার জল লাগানো ৩০ ভরি গহনা যার বাজার মূল্য এক লাখ টাকা উল্লেখ করে থানায় মামলা দায়ের করেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দেওয়া মুকুটটি সোনার বা রুপার তার কোন প্রমান না থাকায় তিনি কিভাবে রুপার উপর সোনার জল লাগানো ও ৩০ ভরি রুপার গহনা হিসেবে উল্লেখ করলেন তা নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়।
(আরকে/এসপি/নভেম্বর ০৮, ২০২৬)
